দ্য ওয়াল ব্যুরো: আর পাঁচটা 'অস্বাভাবিক' শিশুর মতোই বেড়ে উঠছিল সে। অস্বাভাবিক, কারণ জন্ম থেকেই 'ডাউন সিন্ড্রোম'-এ আক্রান্ত সে। তার শরীরের কোষে ২৩ জোড়া অর্থাৎ ৪৬টি ক্রোমোজ়োমের জায়গায় রয়েছে ৪৭টি ক্রোমোজ়োম। এই অতিরিক্ত ক্রোমোজ়োমটিই তার শরীর-মনকে আলাদা করে দিয়েছিল আর পাঁচটা শিশুর থেকে। হাজার হাজার 'স্পেশ্যাল চাইল্ড'-এর মতোই বেড়ে উঠছিল সে।

কিন্তু স্বপ্ন দেখতে জানলে যে কোনও প্রতিবন্ধকতাই বাধা হয় না, তা প্রমাণ করে দিয়েছেন ডাউন সিনড্রোমের শিকার মেডেলিন স্টুয়ার্ট। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন মডেলিংকে! গ্ল্যামার ও ফিটনেস যে পেশায় শেষ কথা, সে পেশাতেই দাপটের সঙ্গে চার বছর ধরে রাজত্ব করছেন মেডেলিন। লন্ডন, প্যারিস, দুবাইয়ের মতো শহরে ৬০টিরও বেশি র্যাম্প-ওয়াকে অংশ নিয়েছেন মেডেলিন৷ ২০১৮ সালের নিউ ইয়র্ক ফ্যাশন উইক শো-তে এক জন দু'জন নয়,সাত-সাত জন ফ্যাশন ডিজাইনারের হয়ে রানওয়েতে হেঁটেছেন মেডেলিন৷

শুরুটা হয়েছিল ২০১৫ সালে। তখন মেডেলিনের বয়স ১৭। অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে মা রোসানে স্টুয়ার্টের সাথে একটি ফ্যাশন প্যারেড দেখতে গিয়েছিলেন মেডেলিন৷ আলোর ঝলকানিতে উজ্জ্বল র্যাম্পে হাঁটতে থাকা দুর্দান্ত সব সুন্দরীদের দিকে সকলের নজর তখন৷ চোখ ফেরাতে পারছিল না কিশোরী মেডেলিনও। তার ইচ্ছে করছিল, সে-ও অমন সেজেগুজে, আলোর ঝলকানিতে সকলকে মুগ্ধ করবে।

সে দিনই মায়ের কাছে মেডেলিন আবদার করে, সে মডেল হতে চায়৷ মেয়ের কথা শুনেই তাকে জড়িয়ে ধরে রোসানে বলেছিলেন, নিশ্চয় মডেল হবে সে৷ না, রোসানের সে দিনের কথা কোনও সাধারণ আশ্বাস ছিল না। তিনি ঠিক করেছিলেন, মেডেলিনের এই ইচ্ছেপূরণে সবটুকু চেষ্টা করবেন তিনি।

শুরুও করে দেন মা-মেয়েতে। ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত অন্যদের মতোই মেডেলিনও অতিরিক্ত স্থূলতায় ভুগছিলেন৷ তাই মডেলিং শুরুর আগেই শারীরিক সমস্যার কারণে ওজন কমাতে রীতিমতো লড়াইয়ে নামেন মেডেলিন৷ ২০১৫ সালেই অন্যদের উৎসাহিত করতে সোশ্যাল মিডিয়ায় মেডেলিনের মেয়ের কিছু ছবি শেয়ার করেন তার মা রোসানে৷ এক সপ্তাহে ৭২ লাখ মানুষ সে পোস্ট দেখে৷ মেডেলিনের এই কঠিন চেষ্টার কথা পরিবেশিত হয় ১৫০টিরও বেশি দেশের সংপাদপত্র থেকে৷

সোশ্যাল মিডিয়ায় মেডেলিনের জনপ্রিয়তা দেখে, তার কথা জানতে পেরে, সাউথ আফ্রিকার ফ্যাশন ডিজাইনার হেনড্রিক ভেরময়লেন নিউ ইয়র্ক ফ্যাশন উইক শো-তে তাঁর সাথে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান মেডেলিনকে৷ এর পর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে৷ একের পর এক বিশ্বখ্যাত ডিজাইনাররা মেডেলিনকে বেছে নেন তাঁদের মডেল হিসেবে৷ এখন মেডেলিন ২১ বছরের তরুণী। বিশ্বের ব্যস্ততম মডেলদের মধ্যে এক জন।

তবে এ সবের মধ্যে
অনেকেই রোসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন মেডেলিনকে দিয়ে জোর করে কাজ করানোর৷ তবে রোসানে বলছেন, "ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত বাচ্চারা একগুঁয়ে প্রকৃতির হয়৷ ফলে তাদের দিয়ে জোর করে কখনেওই কিছু করানো যায় না৷" রোসানের যুক্তি, মেডেলিনকে দিয়ে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ক্যাটওয়াক করানোর চেষ্টা করলে সে হয়তো মাঝপথে হাঁটু গেড়েই বসে থাকত৷ কোনও ভাবেই অংশগ্রহণ করত না। মডেলিংটা মেডেলিন রীতিমতো উপভোগ করেন বলেই দাবি করেছেন মা রোসানে।

রোসানে চেয়েছিলেন, সব বাধা সত্ত্বেও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ পাক মেডেলিন৷ হয়েছেও ঠিক তা-ই৷

শুধু তা-ই নয়। মডেলিংয়ে খ্যাতির পাশাপাশি নিজের জীবনসঙ্গীও খুঁজে নিয়েছেন মেডেলিন৷ প্রেমিক রবির সঙ্গে মেডেলিনের পরিচয় হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ায় এক স্পেশ্যাল অলিম্পিকে৷ রবিও আক্রান্ত ডাউন সিন্ড্রোমে৷ মেডেলিনের প্রতি মুগ্ধ হন তিনিও। এখন দিব্যি মেতে রয়েছেন তাঁরা নিজেদের জগতে, নিজেদের সাফল্যে।