হৃদরোগ শুনলেই মানুষ দুর্ভাবনায় পড়েন, চিন্তা হয় নানারকম। চিকিৎসা ব্যবস্থা যত উন্নতই হোক, হৃদরোগের সমাধান খুঁজতে মানুষ আজও কিছুটা বিপাকে পড়েন। তাই হৃদয়ের হাল সামলাতে এই সংক্রান্ত যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজি। কোন সময়ে আপনি সাবধান হবেন, কী ভাবে এগোবেন চিকিৎসায়, জানাচ্ছেন বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ শিবানন্দ দত্ত। কী বললেন ডাক্তারবাবু?
দ্য ওয়াল: হার্ট অ্যাটাকের কোনও লক্ষণ আছে কি? মানুষ কী করে বুঝবেন হৃদরোগ হয়েছে, কোন কোন লক্ষণ দেখে সাবধান হবেন মানুষজন?
ডাঃ দত্ত: অবশ্যই, রোগীকে আগে বুঝতে হবে কী সমস্যা হচ্ছে। নইলে সে ডাক্তারের কাছে যাবে কী করে? হঠাৎ বুকে ব্যথা করতে পারে। হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ এটা। মাওকার্ডিয়াল ইনফ্রাকশান বলা হয় একে। এক্ষেত্রে শিরায় রক্তের ফ্লো বন্ধ হয়ে যায়। আবার অন্যক্ষেত্রে মাঝে মাঝে ব্যথা করে। একে অ্যাঞ্জাইনা বলে। এতে ফ্লো কমে গেলেও ফ্লো বন্ধ হয় না। সাধারণত খুব দৌড়ঝাঁপ করে কাজ করলে, বা অনেকক্ষণ ধরে হাঁটা চলা করলে, হাঁপিয়ে যান মানুষ। একটু বিশ্রাম করলে আস্তে আস্তে ব্যথা কমে যায়। এক্ষেত্রে আপনার হার্ট যখন দ্রুততার সাথে কাজ করার কথা, তখন শিরা-ধমনী দিয়ে যতটা পরিমাণ রক্ত যাতায়াত করার কথা, ততটা করতে পারে না। তাই এরকম ব্যথা করে। একটু রেস্ট নিলে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয় অবস্থার। অ্যাঞ্জাইনা কোথাও একটা হৃদরোগের আগের সাবধানবাণী বলা যায়। তবে কিছুক্ষেত্রে অ্যাঞ্জাইনা আবার বোঝা যায় না। হঠাৎ করেই বুকে ব্যথা হয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়। শিরা-ধমনী সরু হয়ে গেলে অ্যাঞ্জাইনা হয়। আর একেবারে সেই পথ বন্ধ হয়ে গেলে মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্রাকশান।
দ্য ওয়াল: এর কোনও নির্দিষ্ট বয়স সীমা রয়েছে, না এটা যে কোনও কারও হতে পারে?
ডাঃ দত্ত: আগে প্রৌঢ়দের মধ্যে এই সমস্যা হত, তবে যত দিন যাচ্ছে, খুব অল্প বয়সীদের মধ্যেও এই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অন্য দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে এই প্রবণতা ইদানিং অনেকটাই বেড়ে গেছে। পশ্চিমের দেশগুলোতে হার্ট সংক্রান্ত সমস্যা যে গুলো ৪০-এ শুরু হয়, আজকাল এ দেশে সেই সমস্যা ২৫ থেকে ৩০-এই শুরু হয়ে যাচ্ছে।
মূলত লাইফস্টাইলের সমস্যায় এগুলো হচ্ছে। আগে এত জাঙ্কফুড, কায়িক শ্রম কম করা ইত্যাদি ছিল না। জাঙ্কফুড, কাজের কোনও ঠিকঠাক সময় না থাকা, কায়িক শ্রম বেশি না করে বসে বসে কাজ করা, এগুলো আজকাল সমস্যা বাড়াচ্ছে। হঠাৎ আমাদের সমাজে এগুলো চলে এসেছে। জাঙ্কফুড খেলেও বিদেশিরা নিয়ম করে কায়িক শ্রম করেন। ব্যতিক্রম থাকলেও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সাধারণত যথেষ্ট সচেতন তাঁরা। এখানে কিন্তু সেটা একেবারেই নয়। ভারতকে ডায়াবেটিসের রাজধানী বলা হচ্ছে আজকাল। আমরা কায়িক শ্রম ঠিক করে করি না, তাই হার্টের সমস্যা থেকে শুরু করে ডায়াবেটিস সবই এখানে থাবা বসাচ্ছে। এখানে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত যাঁরা, তাঁদের ক্ষেত্রে করোনারি শিরা বাকিদের থেকে আগে শুকিয়ে যেতে শুরু করে। তাই হার্ট অ্যাটাকের সমস্যাও বাড়ে।
দ্য ওয়াল: তাহলে কি ছোট থেকেই সঠিক ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে হৃদয় সুরক্ষিত রাখা যায়? কী কী ব্যবস্থা নিতে হবে সেক্ষেত্রে?
ডাঃ দত্ত: অ্যাডলেসেন্স থেকেই কিন্তু কোলেস্টরল জমে হার্টের শিরাগুলোতে পলি পড়ার মতো হয়ে যায়। তাই শিরা সরু হয়ে যায়, শেষে হার্ট অ্যাটাক হয়। কোলেস্টেরল জমতে থাকে টিনএজ থেকেই, তবে তার লক্ষণ দেখা যায় ৪০ বছরের পর থেকে। বংশগতভাবে যদি কোলেস্টরল, সুগার, প্রেশারের সমস্যা থাকে, ছোট থেকে খেলাধুলো এবং শরীর চর্চা করতে হবে। তেল জাতীয় খাবার কম খাবে, বা খাবে না। ক্যালোরি দেখে খাবার খেতে হবে। আর অবশ্যই স্মোকিং বা অ্যালকোহলের নেশা করলে চলবে না।
আরও শুনুন ডাঃ দত্ত কী বলছেন অ্যাঞ্জিওগ্রাফি, অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি, বাইপাস সার্জারি, স্টেন্ট নিয়ে কী বলছেন
https://www.youtube.com/watch?time_continue=202&v=hzf9vcdOhSM
দ্য ওয়াল: যে কোনও নেশাই কতটা ক্ষতি করে হার্টের ক্ষেত্রে? আজকাল তো অনেকেই অনেক রকম নেশায় জড়িয়ে পড়ে। কী বলবেন?
ডাঃ দত্ত: যে কোনও নেশাই সমস্যা করে। তবে হার্ট অ্যাটাককে প্রায় তিন গুণ বাড়িয়ে দেয় ধূমপান। আর অ্যালকোহলও সমস্যা করে অনেকটাই। আগে অনেকক্ষেত্রেই বলা হত অ্যালকোহলে অতটা সমস্যা নেই। কিন্তু এখন আর বলা হয় না, অ্যালকোহল সপ্তাহে বড় জোর পরিমিতভাবে এক দু বার খেতে পারেন। কিন্তু কেউই আর এর দু দিনে থেমে থাকে না। কাজেই ওটা একেবারে বাদ দিয়ে দেওয়াই ভালো।
দ্য ওয়াল: বংশগতভাবে কারও উপরের সমস্যাগুলো থাকলে তাঁদের কী ভাবে নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করবেন?
ডাঃ দত্ত: বাবা মা তো বদলাতে পারব না, তার চেয়ে কিছু জিনিসে নজর রাখতে হবে। ব্লাড প্রেশার, সুগার, কোলেস্টরল থাকলে সেগুলো শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যে কোনও নেশা না করাই ভালো। জ়িরো স্মোকিং মাথায় রাখুন, কাটডাউন স্মোকিং এখন পাস্ট। রোজ হাঁটুন। চর্বি জাতীয় খাবার বাদ দেবেন। তেল সারাদিনে ২০ গ্রামের বেশি খাবেন না। এগুলোতে অনেক সময়েই হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা কমানো যায়।
দ্য ওয়াল: এ ক্ষেত্রে পুরুষ মহিলা ভেদে আলাদা করে কোনও বিষয় কাজ করে কি শারীরিক গঠনের জন্য?
ডাঃ দত্ত: কিছুটা। পুরুষদের অ্যাটাক বেশি হয়, মহিলাদের কম হয়। তবে পুরুষদের সেরে ওঠার চান্স বেশি থাকে, মহিলাদের সমস্যা হলে সারতে সময় বেশি লাগে। মহিলাদের মেনোপজের পর হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আর ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের মতো রোগ থাকলে মহিলাদের মেনোপজের আগেও হার্ট অ্যাটাকের সমস্যা হতে পারে। তখন আর হরমোনের সুবিধাগুলো তাঁরা পান না। সাধারণত পুরুষ এবং মহিলাদের যদি আনুপাতিক হারে দেখি তাহলে ৩:১= পুরুষ:মহিলা।
দ্য ওয়াল: আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা কতটা রয়েছে এ দেশে?
ডাঃ দত্ত: গত পাঁচ দশ বছরে আধুনিক চিকিৎসার মান অনেকটাই উন্নত হয়েছে দেশে। বিদেশের মতোই এখানেও নানা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে তা সব জায়গায় পৌঁছয়নি এটাও ঠিক। বাইপাস সার্জারি, ক্যাথল্যাব, অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি, অ্যাঞ্জিওগ্রাফি ইত্যাদি তো রয়েইছে। তবে সব জায়গায় এগুলোকে পৌঁছতেই হবে। কারণ শিরায় রক্ত চলাচলের ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে যদি শিরার মধ্যের রক্তের ফ্লোটা ঠিক করা যায়, তাহলে মাসল ব্লক হয়ে যে মৃত্যুর সম্ভাবনা, তা কাটানো যায়। এই সুযোগের জন্য সব জায়গায় অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি, অ্যাঞ্জিওগ্রাফির ব্যবস্থা রাখতে হবে। এখানে সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই রোগীকে তাড়াতাড়ি ঠিকঠাক হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে নিয়ে যেতে হবে। সবে শুরু হয়েছে সেই কাজ। দেশের সব জায়গায় এই ব্যবস্থা রাখতে হবে।
দ্য ওয়াল: বাইপাস সার্জারি নিয়ে এখনও অনেক মানুষ সঠিকভাবে ঠাওর করতে পারেন না, তাঁদের জন্য কী বলবেন? এক্ষেত্রে সময় অনেকটাই কম লাগে, শারীরিকভাবে কতটা ফিট থাকলে কোনও রোগীর বাইপাস সার্জারি করা যায়?
ডাঃ দত্ত: বাইপাস সার্জারি কিন্তু হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে সঙ্গে করার কোনও প্রয়োজন নেই। এটা একটা প্ল্যানড সার্জারি। যখন অ্যাঞ্জিওগ্রাফির পর দেখা যায় অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করা যাচ্ছে না, স্টেন্টিং করা যাচ্ছে না, তখন বাইপাস সার্জারি করা হয়। মানুষ যদি শারীরিকভাবে অ্যানাস্থেসিয়া ইত্যাদি নেওয়ার ক্ষমতায় না থাকেন, তাহলে তাঁর বাইপাস সার্জারি করা সম্ভব না।
দ্য ওয়াল: হার্টের সার্জারির পরে কতটা সাবধানতা নিতে হবে?
ডাঃ দত্ত: নিয়ম মেনে চলতে তো হবেই। কোনও একটা শিরার সমস্যার জন্য সার্জারি করলেন, কিন্তু তারপর আবার যদি নিয়ম না মেলে চলেন, তাহলে সুগার, প্রেশার, কোলেস্টরল সবই বেড়ে যেতে পারে, বাকি শিরাগুলোয় সমস্যা হতে পারে। তাই একেবারেই নিয়মে থাকতে হবে। স্টেন্ট যদি বসানো হয়, অবশ্যই মনে করে করে ওষুধ খেতে হবে। স্টেন্ট তো ফরেন বডি। মেটালের জাল, সেটায় রক্তের ক্লট জমে গেলে মারাত্মক বিষয় ঘটতে পারে। তাই অন্তত হার্টের সার্জারির এক বছর পর্যন্ত তো খুব নিয়ম মেনেই ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। তারপরেও গাফিলতি করবেন না এ বিষয়ে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কখনওই ওষুধ বন্ধ করবেন না। প্রাথমিক অবস্থা থেকে যা যা করতেন এই রোগীরা , সেগুলোই নিয়ম মেনে করতে হবে। শরীরচর্চা, খাওয়া নিয়ন্ত্রিত, কোনও নেশা না করা ইত্যাদিগুলো মাথায় রাখতে হবে। সুস্থ থাকতে এগুলোই মেনে চলতে হবে।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়