দ্য ওয়াল ব্যুরো: গর্ভে থাকার সময় মায়ের রক্তের কারণে ভ্রূণের (embryo) প্রাণ সংশয় হতে চলেছিল। ২৪ সপ্তাহের গর্ভবতীর ভ্রূণে হাইড্রপের মতো জটিল রোগ ধরা পড়ে। শিশুটির রক্তের সঙ্গে ফ্লুইড মিশে গিয়ে রক্তাল্পতা দেখা দিয়েছিল। চিকিৎসকরা বুঝেছিলেন প্রসবের পরে গর্ভস্থ শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। তাই গর্ভে থাকার সময়েই শিশুর রক্ত বদলের চিকিৎসা করলেন অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের বিশিষ্ট স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা।
গর্ভাবস্থায় শিশুর ব্লাড ট্রান্সফিউশন অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। পূর্ব ভারতে প্রথম এই ধরনের চিকিৎসায় নজির গড়ল অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, পূর্ব ভারতে এমন চিকিৎসার কোনও নজির নেই।
ভ্রূণের (embryo) হাইড্রপ কী?
গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের হাইড্রপ বিরল সমস্যা। চিকিৎসকরা বলছেন, দশ হাজারের মধ্যে একজনের হয় এই রোগ। যদি মায়ের রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হয় তাহলে দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের সময় গর্ভস্থ শিশুর এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। মায়ের রক্তের গ্রুপ যদি A- (নেগেটিভ) এবং বাবার রক্তের গ্রুপ B+ (পজিটিভ) হয়, সন্তানদের রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ বা পজিটিভ দুটোর যে কোনও একটা হতে পারে। শিশু গর্ভে থাকাকালীন নাড়ির মাধ্যমে মায়ের শরীর থেকে তার দেহে রক্ত সঞ্চারিত হয়। একই রকম ভাবে মায়ের শরীরেও কয়েক ফোঁটা করে রক্ত গর্ভস্থ শিশুর শরীর থেকে যায়। চিকিৎসকদের মতে, যেহেতু মায়ের রক্ত নেগেটিভ, তাই সন্তানের রক্ত যদি পজিটিভ হয় সে ক্ষেত্রে মায়ের শরীরে তা গেলে বহিরাগত হিসাবে চিহ্নিত হয়। ফলে সেটা থেকে বাঁচতে তৈরি হয় অ্যান্টিবডিও।
প্রথম সন্তান যদি পজিটিভ ব্লাড গ্রুপ নিয়ে জন্মায়, তাহলে পজিটিভ কোষগুলো অ্যান্টিবডি তৈরি করে ফেলে। দ্বিতীয়বার গর্ভধারণ করলে এই অ্যান্টিবডিগুলো তখন গর্ভস্থ ভ্রূণের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। ফলে ভ্রূণের রক্ত তরল হয়ে যায়। ভ্রূণের হাইড্রপ ধরা পড়লে শিশুদের মৃত্যুর হার ৫০-৯০ শতাংশ অবধি হতে পারে। তাই দ্রুত এই সমস্যা চিহ্নিত করা দরকার।
জটিল চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে কী বলছেন ডাক্তারবাবুরা?
অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের ডিরেক্টর ও এইচওডি (প্রসূতি ও স্ত্রীরোগবিদ্যা) ডাঃ জয়ন্ত কুমার গুপ্ত বলেছেন, "আমরা এখানে অ্যাপোলোতে পূর্ব ভারতে প্রথমবার একটি গর্ভস্থ শিশুর ব্লাড ট্রান্সফিউশন করেছি এবং ভ্রূণের হাইড্রপের মত এই বিরল অবস্থা থেকে শিশুটির জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়েছি। ট্রান্সফিউশনের পরেও, প্রসবের সঠিক সময় নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভস্থ শিশুর ব্লাড ট্রান্সফিউশনে বেশ কিছু ঝুঁকি থাকে, যেমন গর্ভে সংক্রমণের ফলে অকাল প্রসব, অত্যাধিক রক্ত সঞ্চালনের ফলে শিশুটির হার্টফেল, এমনকি রক্ত মায়ের কাছে পৌঁছলে মায়ের মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে।"
বিরল হাইড্রপের চিকিৎসা নিয়ে অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের চিকিৎসক মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, “হাইড্রপ ধরা পড়লে শিশুটির জীবন বাঁচানোর জন্য ভ্রূণের ব্লাড ট্রান্সফিউশনই একমাত্র পথ। এমনকি চিকিৎসার পরেও এই ধরণের শিশুদের বেঁচে থাকার হার অতন্ত্য কম। এই ক্ষেত্রে আমরা ৬টি ব্লাড ট্রান্সফিউশনের পর গর্ভাবস্থার ৩৫তম সপ্তাহে সফলভাবে শিশুটিকে প্রসব করাতে সক্ষম হয়েছি। এই বিশেষ ক্ষেত্রে আমরা রাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে কৃতজ্ঞ আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখে অনুমতি দেওয়ার জন্য।"
ব্লাড ট্রান্সফিউশন চলার সময় শিশু ও মায়ের বিশেষ যত্ন নিতে হয়, জানালেন ডাঃ কাঞ্চন মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “ভ্রূণের মধ্যে ব্লাড ট্রান্সফিউশন অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং জটিল প্রক্রিয়া, তাই এই প্রক্রিয়া চলাকালীন আমাদের শিশুটির এবং মায়ের সর্বোচ্চ যত্ন নিতে হয়েছিল। ছ’টি ট্রান্সফিউশনের মাধ্যমে আমরা শিশুটির হিমোগ্লোবিন মাত্রা ৩ থেকে ১০ পর্যন্ত বাড়াতে পেরেছি এবং সময়মতো প্রসবের ব্যবস্থা করতে পেরেছি।"
ডাক্তারবাবুরা বলছেন, গর্ভাবস্থায় এই ধরনের সমস্যা এড়াতে বিয়ের আগে রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। অ্যান্টি ডি ইমিউনো গ্লোবিউলিনের মতো বেশ কিছু প্রতিষেধক রয়েছে, যা প্রথম প্রসবের পর মায়েদের দেওয়া হয়। দ্বিতীয় গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের হাইড্রপ যাতে না হয় তার জন্য আগে থেকেই সতর্কতা নেওয়া হয়।