ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো (Maria Corina Machado) ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারে (Nobel Peace Prize 2025) ভূষিত। অহিংস আন্দোলন, মানবাধিকার রক্ষা ও গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের প্রতীক তিনি।

নোবেলজয়ী মারিয়া মাচাদো।
শেষ আপডেট: 10 October 2025 16:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভেনেজুয়েলার রাজপথে, দীর্ঘ বছর ধরে চলেছে এক অবিরাম লড়াই। স্বাধীনতার, গণতন্ত্রের, মর্যাদার। সেই সংগ্রামের মুখ, ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলনেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো। শুক্রবার নরওয়ের নোবেল কমিটি ঘোষণা করেছে, ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাচ্ছেন এই সাহসী মহিলা। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের লড়াইকে অহিংস পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যই এই বিশ্বসম্মান।
কমিটির বিবৃতি অনুযায়ী, মাচাদোকে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে “ভেনেজুয়েলার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের সুরক্ষায় তাঁর নিরলস সংগ্রাম এবং স্বৈরাচার থেকে গণতন্ত্রে ন্যায়সঙ্গত ও শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের জন্য।”
নিকোলাস মাদুরোর শাসনের কঠোর সমালোচক মাচাদো বহু বছর ধরে ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের অগ্রভাগে রয়েছেন। অহিংস রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে তাঁর দৃঢ় অবস্থান আন্তর্জাতিক সমাজের মনোযোগ কেড়েছে। মানবাধিকার রক্ষা, মুক্ত নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তরের দাবিতে তিনি দেশ-বিদেশে সমর্থন গড়ে তুলেছেন।
১৯৬৭ সালের ৭ অক্টোবর, ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে জন্ম মারিয়ার। তাঁর বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী হেনরিক মাচাদো জুলোয়াগা এবং মা মনোবিজ্ঞানী কোরিনা পারিস্কা। ছোট থেকেই বাস্তববাদী চিন্তাধারার মানুষ মারিয়া। আন্দ্রেস বেলো ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হওয়ার পর তিনি কারাকাসের IESA থেকে ফিন্যান্সে স্নাতকোত্তর করেন। এই বাস্তব ও বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষা পরে তাঁর রাজনৈতিক ভাবনাকেও বাস্তবমুখী করে তোলে।
২০০২ সালে মাচাদো সহ-প্রতিষ্ঠা করেন ‘সুমাতে’ (Súmate)—একটি নাগরিক সংস্থা, যার লক্ষ্য ছিল দেশে মুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের ভোটাধিকারের সুরক্ষা। সেখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু। দ্রুতই তিনি ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্র রক্ষার মুখ হয়ে ওঠেন।
২০১৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভেন্তে ভেনেজুয়েলা’ (Vente Venezuela) নামের একটি উদারনৈতিক রাজনৈতিক দল, যার মন্ত্র হল, ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাজারভিত্তিক উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা। বছরের পর বছর ধরে ভেনেজুয়েলার শীর্ষ আসন আগলে রাখা উগো সাভেজকে গদি থেকে সরানোর কাণ্ডারী ছিলেন নেত্রী মারিয়া।
দু'দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই লড়াইয়ে মাচাদো পেয়েছেন বারবার হুমকি, নিপীড়ন, এমনকি মামলা। মাদুরো সরকারের কঠোর দমননীতি ও সেনা-নিয়ন্ত্রিত রাজনীতির মাঝেও তিনি কখনও পিছিয়ে যাননি। ২০২৪ সালে তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী জোটের প্রার্থী হিসেবে উঠে আসেন। কিন্তু মাদুরো সরকার তাঁর মনোনয়নই বাতিল করে দেয়।
তবু তিনি থামেননি। আর এক বিরোধী নেতা এডমুন্ডো গঞ্জালেস উর্রুতিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি গড়ে তোলেন এক বিশাল আন্দোলন। দেশজুড়ে লাখো স্বেচ্ছাসেবীকে একত্র করে নির্বাচনের সময় ভোটরক্ষীদের সংগঠিত করেন।
যখন মাদুরো প্রশাসন বিরোধীদের সম্ভাব্য জয় স্বীকার করতে অস্বীকার করে, তখন মাচাদো প্রকাশ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের যাচাই করা ভোটগণনার তথ্য প্রকাশ করেন। এই সাহসী পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সমাজকে নাড়া দেয়।
আজ, সেই অনমনীয় মনোভাবেরই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে নোবেল শান্তি পুরস্কারে। তিনি বর্তমানে আত্মগোপন করে রয়েছেন তিনি। কারণ মাদুরো সরকার তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। কিন্তু এই লুকিয়ে থাকা অবস্থাতেও তিনি ভেনেজুয়েলার লক্ষ মানুষের অনুপ্রেরণা।
নোবেল কমিটির ভাষায়, “মারিয়া করিনা মাচাদো লাতিন আমেরিকার গণতন্ত্র রক্ষার অন্যতম সাহসী কণ্ঠ। তিনি প্রমাণ করেছেন, ণতন্ত্রের লড়াই বুলেট নয়, ব্যালটে জেতা যায়।”
আজ ভেনেজুয়েলায় কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য ও দমননীতির শিকার। প্রায় আশি লক্ষ নাগরিক দেশ ছেড়েছেন। কিন্তু মাচাদোর জেদ, বিশ্বাস আর শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ তাঁদের মনে এক নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে—যে আলো গণতন্ত্রের পথ দেখায়।