এই অধিবেশনের আগে চিনের সামরিক বাহিনীর একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে দুর্নীতির অভিযোগে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন প্রতিনিধির সাংসদ পদও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাই অধিবেশনে কিছু আসন ফাঁকা থাকলে সেটিও রাজনৈতিক বার্তা বহন করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

শি চিনফিং
শেষ আপডেট: 4 March 2026 11:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইরান যুদ্ধ চলছে। তার মধ্যেও এখন গোটা বিশ্বের নজর রয়েছে বেজিংয়ের উপর। এ সপ্তাহেই শুরু হচ্ছে চিনের রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক বৈঠক— ‘টু সেশনস’ (Two Sessions)। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, উন্নয়নের লক্ষ্য এবং নীতিগত দিকনির্দেশ ঠিক করার ক্ষেত্রে এই বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
প্রতি বছরই চিনের শাসক কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এই দুই গুরুত্বপূর্ণ সভা হয়। এ বছরের বৈঠকে বিশেষ নজর থাকবে চিনের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির লক্ষ্য, নতুন পাঁচ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা (Five Year Plan) এবং প্রযুক্তি ও শিল্পক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ কৌশলের উপর।
বিশ্বের নজর কেন বেজিংয়ে?
ইলেকট্রিক গাড়ি, সোলার প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) থেকে শুরু করে হিউম্যানয়েড রোবট—গত কয়েক বছরে চিন প্রযুক্তি ও শিল্পক্ষেত্রে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অগ্রগতি কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ফল। তাই এ বছরের বৈঠকে কী ধরনের নতুন শিল্পনীতি বা প্রযুক্তি-নির্ভর উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণা হয়, তার দিকে নজর রাখছে গোটা বিশ্ব।
কী এই ‘টু সেশনস’?
‘টু সেশনস’ বলতে মূলত দুটি আলাদা বৈঠককে বোঝায়। প্রথমটি হল চাইনিজ পিপলস পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্স (CPPCC)—এটির কাজ পরামর্শ দেওয়া। এই বৈঠক আজ বুধবার শুরু হয়েছে। প্রায় দু’ হাজারের বেশি সদস্য এতে অংশ নিয়েছেন। এঁদের মধ্যে শুধু কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যই নন, বিভিন্ন পেশা ও ক্ষেত্রের প্রতিনিধিরাও থাকেন। যদিও এই সংস্থার কোনও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা নেই, তবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নীতি নিয়ে আলোচনা হয় এখানেই।
দ্বিতীয়টি হল ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস (NPC)—চিনের জাতীয় সংসদ। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া এই অধিবেশনে প্রায় তিন হাজার প্রতিনিধি অংশ নেবেন। সংবিধান সংশোধন, বাজেট অনুমোদন বা নতুন আইন তৈরির ক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে অনেকেই এই সংসদকে ‘রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্ট’ বলে থাকেন, কারণ বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত আগেই কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে নির্ধারিত হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠক?
বাইরের থেকে এই অধিবেশন অনেকটাই পূর্বনির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হলেও, চিনের ভবিষ্যৎ নীতি বোঝার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক দশকে চিনের অর্থনীতি আরও উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত হোক বা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর নীতি—সব কিছুরই ইঙ্গিত প্রথম পাওয়া গিয়েছিল এই বার্ষিক বৈঠকগুলিতেই। এছাড়া শিল্পনীতি, প্রযুক্তি উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা, এমনকি ‘সফট পাওয়ার’ বাড়ানোর পরিকল্পনাও আগের বিভিন্ন অধিবেশনে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় দফায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্সির অনিশ্চয়তার মধ্যে অনেক পশ্চিমি দেশই বেজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে চাইছে। ইতিমধ্যেই ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার এবং কানাডার মার্ক কার্নির মতো নেতারা চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
এ বছর কী কী সিদ্ধান্ত হতে পারে?
এবারের ‘টু সেশনস’-এ একটি বিতর্কিত “এথনিক ইউনিটি” আইন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির আশঙ্কা, এই আইনের মাধ্যমে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর উপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হতে পারে।খসড়া আইনে ম্যান্ডারিন ভাষার গুরুত্ব বাড়ানো, সংখ্যালঘু ভাষার ব্যবহার কমানো এবং শিশুদের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আনুগত্য শেখানোর মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়াও পরিবেশ ও জলবায়ু সংক্রান্ত নতুন ‘ইকোলজিক্যাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট কোড’ অনুমোদনের সম্ভাবনাও রয়েছে। এতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং কম-কার্বন উন্নয়নের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের গভর্নমেন্ট ওয়ার্ক রিপোর্ট। এই রিপোর্টে গত বছরের অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সের মূল্যায়নের পাশাপাশি আগামী বছরের নীতিগত লক্ষ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়। গত কয়েক বছর ধরে চিনের বৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল প্রায় ৫ শতাংশ। যদি এবার সেই লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়, তাহলে বোঝা যাবে যে চিন দ্রুত বৃদ্ধির বদলে আরও স্থিতিশীল ও গুণগত উন্নয়নের পথে হাঁটতে চাইছে।
নতুন পাঁচ বছরের পরিকল্পনা
এই বছরের অধিবেশনের আরেকটি বড় দিক হল ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের জন্য নতুন পাঁচ বছরের পরিকল্পনা অনুমোদন। এই নথিতে আগামী কয়েক বছরে চিনের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও শিল্পক্ষেত্রে কী ধরনের কৌশল নেওয়া হবে তার বিস্তারিত রূপরেখা থাকবে।বিশেষ করে উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা বাড়ানোর পরিকল্পনার দিকে নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।
সামরিক ও প্রশাসনে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান
এই অধিবেশনের আগে চিনের সামরিক বাহিনীর একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে দুর্নীতির অভিযোগে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন প্রতিনিধির সাংসদ পদও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাই অধিবেশনে কিছু আসন ফাঁকা থাকলে সেটিও রাজনৈতিক বার্তা বহন করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।