ব্লু স্প্যারো ইজরায়েলের তৈরি একটি এয়ার-লঞ্চড ব্যালিস্টিক মিসাইল। অর্থাৎ যুদ্ধবিমান থেকে এটি ছোঁড়া হয়। এই মিসাইল তৈরি করেছে ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা সংস্থা রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস।

শেষ আপডেট: 6 March 2026 19:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে এক অদ্ভুত ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রর কথা— দ্য ব্লু স্প্যারো (Blue Sparrow)। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের দাবি, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে ইজরায়েলের হামলায় এই মিসাইলই ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অস্ত্রের বিশেষত্ব হল—এটি আকাশের অনেক ওপরে উঠে প্রায় সোজা নিচে নেমে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। তাই অনেকেই একে বলছেন ‘মহাকাশ থেকে আসা মিসাইল’।
ব্লু স্প্যারো কী ধরনের মিসাইল?
ব্লু স্প্যারো (Blue Sparrow) ইজরায়েলের তৈরি একটি এয়ার-লঞ্চড ব্যালিস্টিক মিসাইল। অর্থাৎ যুদ্ধবিমান থেকে এটি ছোঁড়া হয়। এই মিসাইল তৈরি করেছে ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা সংস্থা রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমস।

ব্লু স্প্যারো
এটি আসলে স্প্যারো সিরিজের একটি অংশ। এই সিরিজে রয়েছে—ব্লু স্প্যারো, ব্ল্যাক স্প্যারো এবং সিলভার স্প্যারো। প্রথমে এগুলো তৈরি করা হয়েছিল ইজরায়েলের অ্যারো মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম পরীক্ষা করার জন্য। অর্থাৎ শত্রুপক্ষের ব্যালিস্টিক মিসাইলের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দক্ষতা যাচাই করতেই এই মিসাইল ব্যবহার করা হত।
এই মিসাইলের গঠন কেমন?
ব্লু স্প্যারোর দৈর্ঘ্য প্রায় ৬.৫ মিটার, ওজন প্রায় ১৯০০ কিলোগ্রাম। এতে ব্যবহার করা হয়েছে সলিড রকেট ফুয়েল। এটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে দুটি প্রযুক্তির সাহায্য নেয়— জিপিএস (GPS) এবং আইএনএস (INS) তথা ইনারশিয়াল ন্যাভিগেশন সিস্টেম। এই আইএনএস প্রযুক্তি মিসাইলকে নিজের গতিপথ নিজেই হিসাব করে ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
কীভাবে লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করে?
এই মিসাইলের আক্রমণের কৌশলই একে অনন্য করে তুলেছে। প্রথমে একটি যুদ্ধবিমান থেকে তথা অনেক উচ্চতা থেকে মিসাইলটি ছোঁড়া হয়। এরপর এটি দ্রুত গতিতে আকাশের দিকে উঠে যায় এবং প্রায় বায়ুমণ্ডলের প্রান্ত ছুঁয়ে ফেলে। সেই সময় মিসাইলের সামনের অংশ আলাদা হয়ে যায়। এই অংশটিকেই বলা হয় রিএন্ট্রি ভেহিকল। সেটি প্রায় খাড়া ভাবে নিচে নেমে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ছুটে আসে এবং অত্যন্ত নির্ভুলভাবে আঘাত হানে।
আটকানো এত কঠিন কেন?
বেশিরভাগ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এমনভাবে তৈরি হয় যাতে দিগন্তের দিক থেকে আসা মিসাইল ধরা যায়। কিন্তু ব্লু স্প্যারো প্রায় সোজা ওপর থেকে নিচে পড়ে। তার উপর এটি শব্দের গতির কয়েক গুণ বেশি গতিতে নেমে আসে। ফলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যখন এটিকে শনাক্ত করে, তখন অনেক সময়ই ঠেকানোর সুযোগ থাকে না।
খামেনি হত্যার ঘটনায় কী জানা যাচ্ছে?
২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে ইজরায়েলের হামলায় একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। ইজরায়েল এই অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর একে বলে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের দাবি, হামলার পর তেহরানের একটি কম্পাউন্ড থেকে খামেনির দেহ উদ্ধার হয়। ১ মার্চ তাঁর মৃত্যুর খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। এরপর ইরানে ৪০ দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে।
ব্লু স্প্যারো থেকেই তৈরি আরও শক্তিশালী মিসাইল
ব্লু স্প্যারো মূলত পরীক্ষামূলক মিসাইল হলেও একই প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে পরে তৈরি হয়েছে ROCKS নামে আরও শক্তিশালী যুদ্ধাস্ত্র। এই মিসাইল—প্রায় ৫০০ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে পারে। লক্ষ্যবস্তুর ৩ মিটারের মধ্যে আঘাত করতে সক্ষম। সেই সঙ্গে জিপিএস জ্যামিং থাকলেও কাজ করতে পারে। তা ছাড়া রকস্ ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা চালাতে পারে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্লু স্প্যারো ছিল প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ধাপ। আর রকস্ সেই প্রযুক্তির উন্নত যুদ্ধ সংস্করণ। খামেনির মৃত্যু এবং ব্লু স্প্যারোর মতো উন্নত অস্ত্র ব্যবহারের খবর সামনে আসার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে এমন মিসাইলের ব্যবহার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।