ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে (Venezuela President Nicolas Maduro) আমেরিকার (America) সামরিক অভিযানে অপহরণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরানের (Tehran) দিকে প্রচ্ছন্ন বার্তা ছুড়ে দেন ইজরায়েলের (Israel) বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ।
.jpeg.webp)
ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দু আপাতত তেহরান।
শেষ আপডেট: 6 January 2026 12:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে (Venezuela President Nicolas Maduro) আমেরিকার (America) সামরিক অভিযানে অপহরণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরানের (Tehran) দিকে প্রচ্ছন্ন বার্তা ছুড়ে দেন ইজরায়েলের (Israel) বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ। তাঁর হুঁশিয়ারি, ভেনেজুয়েলায় যা ঘটছে, ইরানের (Iran) শাসকদের তা গভীরভাবে লক্ষ্য করা ও বিশ্লেষণ করা উচিত। এই মন্তব্য নিছক কূটনৈতিক বক্তব্য নয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি ইঙ্গিত। ওয়াশিংটন যদি লাতিন আমেরিকায় একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে শক্তি প্রয়োগ করে সরাতে পারে, তবে তেলভাণ্ডার আরব দুনিয়াও সেই নজিরের বাইরে নয়।
মাদুরোকে অপসারণের ঘটনা ঘটেছে, ঠিক তার আগেই, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার হুমকি দেন। প্রকাশ্যে না হলেও, ওয়াশিংটন–তেলআবিব মিত্রশক্তি যে এখন স্বার্থ-বিরোধী সরকার বদলের ভাবনায় সক্রিয়— তা গোপন নেই। যদিও ভেনেজুয়েলা ও ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলাদা। তবু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোর বিরুদ্ধে এই দৃষ্টান্ত ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের (NIAC) প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি বলেন, এই নতুন আইনহীনতা বিশ্বকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে। আর অস্থিতিশীলতা মানেই যুদ্ধের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া। তাঁর মতে, ট্রাম্প যদি ‘সার্জিক্যাল রেজিম চেঞ্জ’-এর ধারণায় মুগ্ধ হয়ে পড়েন, অথবা নেতানিয়াহুকে একই ধরনের পদক্ষেপের জন্য সবুজ সংকেত দেন, তাহলে ইরানকে ঘিরে নতুন যুদ্ধের গতি রোধ করা কঠিন হবে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মরতাজাভির পর্যবেক্ষণ আরও সরাসরি। তাঁর ভাষায়, ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার এই পদক্ষেপ ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বগ্রাসী’ মনোভাবকেই তুলে ধরে, যেখানে আলোচনার জায়গা প্রায় নেই। তিনি বলেন, তেহরান থেকে যা শোনা যাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট—ইরান ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী নয়, কারণ ওয়াশিংটন কার্যত ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ চায়। এই পরিস্থিতিতে কূটনীতির পথ সংকুচিত হচ্ছে, আর তার জায়গা নিচ্ছে সংঘাতের সম্ভাবনা। বর্তমানে ইজরায়েল, ইরান ও আমেরিকা, এই তিন পক্ষই যেন এক বিপজ্জনক সংঘর্ষপথে হাঁটছে।
মাদুরো অপহরণের পিছনে শুধু ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, রয়েছে ইরানের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার ঘনিষ্ঠতাও। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত এই দুই দেশ বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছিল, যার আর্থিক পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে বলে ধারণা। মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও মাদুরোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ককে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন। এমনকী কোনো দৃঢ় প্রমাণ ছাড়াই ভেনেজুয়েলাকে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লার জন্য পশ্চিম গোলার্ধে ঘাঁটি তৈরির অভিযোগও করা হয়েছে।
মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় ইরানের আঞ্চলিক মিত্রবলয় আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন ও লেবাননে হিজবুল্লার দুর্বলতার পর যা তেহরানের জন্য বড় ধাক্কা।
ইরান দ্রুতই ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার অভিযানের নিন্দা জানিয়ে একে “অবৈধ আগ্রাসন” বলে অভিহিত করেছে। তেহরানের বক্তব্য— এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তাকে গুরুতরভাবে বিপন্ন করছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মাদুরোর অপহরণ ইরানকে আরও কঠোর পথে ঠেলে দিতে পারে। তা সামরিক প্রতিরোধ জোরদার করা, কিংবা সম্ভাব্য মার্কিন বা ইজরায়েলি হামলার আগাম জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়াও হতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন— ইরানে সরকার যদি বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী পথে যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র খুব কঠোরভাবে আঘাত হানবে। একই বক্তব্য তিনি একাধিকবার পুনরাবৃত্তি করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, ভেনেজুয়েলার মতো করে কি ইরানেও সরকার ফেলতে বা নেতৃত্ব অপসারণের পথে হাঁটতে পারে আমেরিকা ও ইজরায়েলের চরবাহিনী মোসাদ? উত্তর এখনও অনিশ্চিত। তবে মাদুরো অপহরণের পর যে বার্তাটি স্পষ্ট—বিশ্ব রাজনীতি আবার এমন এক পর্যায়ে ঢুকছে, যেখানে শক্তির ভাষা কূটনীতিকে গ্রাস করে ফেলছে। আর সেই ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দু আপাতত তেহরান।