বৈঠক ব্যর্থ হওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে ভারত। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই ভারত বড় আকারে সস্তা রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল কিনছে। কিন্তু এর ফলে আমেরিকার অসন্তোষ ক্রমশ বাড়ছে।

শেষ আপডেট: 16 August 2025 11:15
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের (Trump Putin meeting) বহুল আলোচিত আলাস্কা বৈঠক শেষ হল অমিমাংসিতভাবে। প্রায় ৩ ঘণ্টার কথোপকথনের পরও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট চুক্তি বা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হয়নি। বৈঠকের শেষে দুই নেতা কিছুটা অগ্রগতির দাবি করলেও বাস্তবে কোনও সুনির্দিষ্ট সমাধান সূত্র বেরিয়ে আসেনি। ফলে ভারতের জন্য বাড়ছে অনিশ্চয়তা। কারণ, রাশিয়ার তেলের উপর নির্ভরশীলতার জন্য ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের আঘাতের মুখে দাঁড়িয়ে দিল্লি।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আক্রমণের পর থেকে পশ্চিমা দুনিয়ায় কার্যত একঘরে পুতিন। সেই অবস্থায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে এই বৈঠক ক্রেমলিনের কাছে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেই ধরা হচ্ছে। আলাস্কার জয়েন্ট বেস এলমেনডর্ফ-রিচার্ডসনে শুরু হয়েছিল বৈঠক, লাল কার্পেট অভ্যর্থনা ও সামরিক বিমানের প্রদর্শনী দিয়ে। পুতিনকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ট্রাম্প।
বৈঠক শেষে প্রেস কনফারেন্সে ট্রাম্প বলেন, “আমরা কিছুটা এগিয়েছে তবে কোনও ডিল বা চুক্তি হয়নি।” অন্যদিকে পুতিন বলেন, আলোচনায় কিছু ইতিবাচক দিক খুঁজে পাওয়া গিয়েছে এবং তিনি আশা করছেন আমেরিকার ইউরোপীয় মিত্ররা এই অগ্রগতিতে বাধা দেবে না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই বৈঠকে ইউক্রেনের কোনও প্রতিনিধি ছিলেন না। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, রাশিয়াকে কোনও ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই নেই। তিনি লিখেছেন, “ইটস টাইম টু এন্ড দ্য ওয়ার… আমরা আমেরিকার উপর ভরসা করছি।”
ট্রাম্প যদিও পরে ফক্স নিউজে জানান, বৈঠকে সম্ভাব্য জমি বদল (land swap) ও নিরাপত্তা গ্যারান্টির মতো বিষয় আলোচনায় উঠেছে। তাঁর দাবি, “আমরা অনেকটাই কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। এখন ইউক্রেনের সম্মতি দরকার।” তবে পুতিন নিজের অবস্থানেই অনড়—রাশিয়ার মতে, যুদ্ধের ‘মূল কারণগুলো’ মেটানো ছাড়া শান্তি সম্ভব নয়।
বৈঠক ব্যর্থ হওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে ভারত। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই ভারত বড় আকারে সস্তা রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল কিনছে। কিন্তু এর ফলে আমেরিকার অসন্তোষ ক্রমশ বাড়ছে। ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে, রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ না করলে ভারতের রফতানির উপর অতিরিক্ত ২৫% শুল্ক চাপানো হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ২৫% জরিমানা—ফলে কার্যত মোট ৫০% শুল্ক।
ভারত চায় অন্তত এই সিদ্ধান্ত স্থগিত থাকুক, কারণ ২৭ অগস্ট থেকে নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা। তবে বৈঠকে কোনও ইতিবাচক ফল না আসায় এখন দিল্লিকে নতুন কৌশল ভাবতে হবে। শুল্কের চাপ সহ্য করা কঠিন হলে হয় রাশিয়ান তেলের উপর নির্ভরতা কমাতে হবে, নয়তো বিকল্প বাজার খুঁজতে হবে।
ফক্স নিউজে সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানিয়েছেন, পুতিনের সঙ্গে অগ্রগতির কারণে আপাতত চীনের উপর নতুন শুল্ক চাপাচ্ছেন না। তবে ভারতের নাম সেখানে উল্লেখ করেননি। ফলে ভারতের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনকে সাময়িক ছাড় দিয়ে ভারতকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে যাতে দিল্লি দ্রুত রাশিয়ান তেল কেনা থেকে সরে আসে।
বৈঠক চলাকালীনই ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে বিমান হামলার সাইরেন বাজে। রাশিয়া দাবি করেছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এক রাতে ২৯টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস করেছে। এই পরিস্থিতি দেখিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈঠকের কোনও চুক্তি না হলেও যুদ্ধ থামেনি। বরং সংঘাত বাড়ছে।
ইউক্রেন থেকে শতাধিক শিশু অপহরণের অভিযোগে পুতিনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) ওয়ারেন্ট রয়েছে। যদিও রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেউই আইসিসি’র সদস্য নয়। এই অবস্থায় ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়াকে পুতিন নিজের আন্তর্জাতিক অবস্থান পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
বৈঠকের শেষে ট্রাম্প বলেন, “শিগগিরই আবার দেখা হবে।” পুতিন জবাব দেন, “পরের বার মস্কোয়”। ট্রাম্প হেসে বলেন, “এ নিয়ে কিছু সমালোচনা হবে, তবে এটা সম্ভব।”
আলাস্কার বৈঠক থেকে শান্তির কোনও নীলনকশা বেরোয়নি। ইউক্রেনের যুদ্ধ থামার আশা ক্ষীণই রইল। আর ভারতের সামনে আরও জটিল সমীকরণ—সস্তা তেলের সুবিধা বনাম শুল্কের বোঝা। ২৭ অগস্টের সময়সীমার আগে কোনও সমাধান না এলে ভারতের অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি দু’দিকেই বড় চাপ তৈরি হতে চলেছে।