দীপাবলি উপলক্ষে পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দেশের হিন্দু নাগরিকদের উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর এই আচরণকে ভণ্ডামি বলে আক্রমণ করেছেন নেটিজেনদের একটা বিরাট অংশ।

শাহবাজ শরিফ
শেষ আপডেট: 21 October 2025 17:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রতিদিন এমন ঘটে না। কোনও উৎসবের শুভেচ্ছা বার্তাই যখন এক দেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী (Pakistan PM) শাহবাজ শরিফের (Shehbaz Sharif) ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে। দীপাবলির শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে তিনি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় কঠোর সমালোচনার মুখে।
দীপাবলি উপলক্ষে পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দেশের হিন্দু নাগরিকদের (Pakistani Hindus) উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর এই আচরণকে ভণ্ডামি বলে আক্রমণ করেছেন নেটিজেনদের একটা বিরাট অংশ। শরিফের এই শুভেচ্ছাবার্তার পোস্টের পরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড়। বহু নেটিজেন শরিফকে ‘ভণ্ড’ বলে আখ্যা দিয়ে প্রশ্ন তোলেন - যে দেশে সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তা পায় না, সেখানে প্রধানমন্ত্রী কী করে দিওয়ালি উদযাপন করেন?
On the auspicious occasion of Diwali, I extend my heartfelt greetings to our Hindu community in Pakistan and around the world.
As homes and hearts are illuminated with the light of Diwali, may this festival dispel darkness, foster harmony, and guide us all toward a future of…— Shehbaz Sharif (@CMShehbaz) October 20, 2025
এই ক্ষোভের মূল কারণ পাকিস্তানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান নিপীড়ন ও বৈষম্য। তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা ২৪ কোটি ৪০ লক্ষেরও বেশি। তার মধ্যে হিন্দুর সংখ্যা মাত্র ৩৮ লক্ষ - অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার মাত্র ১.৬৩ শতাংশ। অথচ প্রাচীন কালে সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকেই পাকিস্তানের ভূখণ্ডে হিন্দুদের বসবাস ছিল সমৃদ্ধ।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে পাকিস্তানে হিন্দুদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ। এখন তা নেমে এসেছে ২ শতাংশের কাছাকাছি। উদাহরণ হিসেবে লাহৌর শহরে ১৯৪১ সালে হিন্দু-শিখ জনসংখ্যা ছিল ৪০ শতাংশ, আজ তা নামমাত্র ১ শতাংশেরও কম।
পাকিস্তানে সংখ্যালঘুরা নানা আইনি ও সামাজিক বাধার মুখেও পড়েন। সংবিধান অনুযায়ী, কেবল মুসলমান নাগরিকই হতে পারেন রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী। ‘ব্লাসফেমি আইন’ অনুযায়ী ধর্মনিন্দার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া যেতে পারে - যা অনেক সময় সংখ্যালঘুদের ভয় দেখাতে ব্যবহার হয়।
অমুসলিমদের জন্য কোনও পৃথক পারিবারিক আইন নেই। ফলে হিন্দুদের বিবাহ, তালাক বা সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ আইনি স্বীকৃতি পায় না। প্রতিবছর হাজার হাজার হিন্দু নারী অপহৃত হয়ে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত হন— এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
নিম্নবর্ণের হিন্দুরা আজও জবরদস্তি শ্রমে বাধ্য হচ্ছেন। ১৯৯২ সালে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে তা আজও চলছে। গ্লোবাল স্লেভারি ইনডেক্সের হিসেব অনুযায়ী, পাকিস্তানে এখনও প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ ঋণ-শ্রমে আবদ্ধ। মানবাধিকার কর্মীদের দাবি, প্রভাবশালী জমিদাররা গরিব হিন্দুদের ঋণ দিয়ে এমন অবস্থায় ঠেলে দেন যেখান থেকে মুক্তি প্রায় অসম্ভব। মহিলারা সেখানে যৌন নির্যাতনেরও শিকার হন।
দেশজুড়ে হিন্দু মন্দিরগুলির অবস্থাও শোচনীয়। পাকিস্তানে বর্তমানে কার্যত ৩০০-রও কম মন্দির টিকে আছে, যার মধ্যে অল্প কিছু কার্যকর। দেশভাগের পর থেকে হাজার হাজার মন্দির ভেঙে ফেলা হয়েছে। এমনকী হিন্দুদের পবিত্র স্থান হিঙ্গলাজ মাতার মন্দিরও উগ্রপন্থীদের আক্রমণের শিকার হয়েছে।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে করাচির সোলজার বাজারে ১৫০ বছরের পুরনো মারি মাতার মন্দিরও ভেঙে ফেলা হয়, ‘পুরনো ও বিপজ্জনক কাঠামো’ বলে।
ভারত সরকারের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে হিন্দুদের উপর হিংসার ঘটনা ২০২২ সালে ছিল ২৪১টি, ২০২৩-এ তা কমে দাঁড়ায় ১০৩-এ, কিন্তু ২০২৪ সালের অক্টোবরে আবার বেড়ে হয় ১১২টি। এমন পরিস্থিতিতে শাহবাজ শরিফের দিওয়ালি শুভেচ্ছা অনেকের কাছেই যেন এক প্রহসন।
সকলের বক্তব্য, দেশ যখন সংখ্যালঘু হিন্দুদের ন্যূনতম নিরাপত্তা ও মর্যাদা দিতে ব্যর্থ, তখন শান্তি ও সহনশীলতার বার্তা দেওয়া আদতে নিছক ভণ্ডামিই।