কথার ফাঁকে যোগ দেন ৪১ বছরের জেফ্রি এপস্টিন (Epstein)। স্কলারশিপ, তাঁর নামে ক্যাম্প লজ। এই সব গল্পেই তৈরি হয় প্রথম বিশ্বাস। ‘দ্য টাইমস’-এর রিপোর্ট বলছে, সেই মুহূর্তই ছিল এক সুপরিকল্পিত শোষণের প্রথম ধাপ (Jeffrey Epstein)।

ছবি: সংগৃহীত
শেষ আপডেট: 8 February 2026 20:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আইসক্রিম খেতে খেতে হালকা কথাবার্তা। সেখান থেকেই শুরু। মিশিগানের একটি গ্রীষ্মকালীন আর্টস ক্যাম্পে ১৪ বছরের এক কিশোরীর (নথিতে নাম ‘জেন’) সঙ্গে পরিচয় হয় ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের। হাতে ইয়র্কশায়ার টেরিয়ার, পাশে হেঁটে চলা। সবই ছিল নিরীহ। কথার ফাঁকে যোগ দেন ৪১ বছরের জেফ্রি এপস্টিন (Epstein)। স্কলারশিপ, তাঁর নামে ক্যাম্প লজ। এই সব গল্পেই তৈরি হয় প্রথম বিশ্বাস। ‘দ্য টাইমস’-এর রিপোর্ট বলছে, সেই মুহূর্তই ছিল এক সুপরিকল্পিত শোষণের প্রথম ধাপ (Jeffrey Epstein)।
এর পর ফ্লোরিডার পাম বিচে গিয়ে জেনের মায়ের মন জয় করেন এপস্টিন। মেয়ের ‘সম্ভাবনা’র প্রশংসা করে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি, আমন্ত্রণ— সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে টেনে নেওয়া হয় নিজের জগতে। কয়েক মাসের মধ্যেই টাকার বিনিময়ে ‘মাসাজ’ দিতে শুরু করে জেন। যা দ্রুত রূপ নেয় যৌন নির্যাতনে। প্রায় তিন বছর ধরে সে আটকে ছিল এই চক্রে।
জেন একা নয়। মার্কিন বিচার দফতরের (DoJ) প্রকাশিত ৩৫ লক্ষ পৃষ্ঠার নথিতে এমন শত শত অভিজ্ঞতার উল্লেখ রয়েছে ইমেল, পুলিশ রিপোর্ট, ছবি ও প্রত্যক্ষ বয়ান মিলিয়ে। বিচার দফতরের হিসেব, এপস্টিনের নির্যাতনের শিকার এক হাজারেরও বেশি নারী; অধিকাংশের পরিচয় আজও গোপন।
প্রলোভন, নিয়োগ আর টাকার ফাঁদ
স্থানভেদে এপস্টিনের কৌশল বদলাত। ফ্লোরিডায় আর্থিকভাবে দুর্বল এলাকার মেয়েদের ‘ম্যাসাজ’-এর জন্য নগদ অর্থের টোপ। নিউ ইয়র্কে লক্ষ্য ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণীরা স্কলারশিপ, ‘এলিট’ যোগাযোগ, ম্যানহাটনের পার্টির আমন্ত্রণ। পূর্ব ইউরোপে মডেলিংয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হত।
এই গোটা প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে ছিলেন ম্যাক্সওয়েল। সাক্ষ্য অনুযায়ী, স্কুলে ঘুরে পারিবারিক পরিস্থিতি জেনে দুর্বলতা খুঁজতেন তিনি। সিনেমা দেখা, শপিং, উপহার— এই সব ‘নিরীহ’ যত্নেই চলত গ্রুমিং। একটি ‘মাসাজ’-এর জন্য ৩০০ ডলার, আর সঙ্গে বন্ধুকে আনলে আরও ৩০০। এভাবেই নিজে নিজে ছড়িয়ে পড়ত নিয়োগের জাল।
পাম বিচ, নিউ ইয়র্ক, নিউ মেক্সিকো কিংবা ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের ব্যক্তিগত দ্বীপ, দেশ-বিদেশে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হত 'শিকারদের'। কারও থাকার ব্যবস্থা লন্ডন বা প্যারিসেও। ভাড়া, চিকিৎসা, পড়াশোনা, সব খরচ বহন করে নির্ভরশীলতা তৈরি করা হত। কারও কারও কাছে আবার অন্যদের ‘প্রাইভেট সেশন’-এ আনতে বলা হত। ইমেলে ধরা পড়ে অর্থ, টিউশন ও রিসোর্সের সূক্ষ্ম পরিকল্পনা, পালানোর রাস্তা ক্রমশ বন্ধ হয়ে যেত।
স্তরে স্তরে শোষণের নেটওয়ার্ক
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই চক্র আরও সংগঠিত হয়। ইমেলে ‘মাসাজের জন্য বন্ধু খোঁজা’, বয়স-চেহারা-বুদ্ধির ভিত্তিতে নির্বাচন— সবই নথিভুক্ত। স্কুলবন্ধুদের টেনে আনার পর্যায় পেরিয়ে তৈরি হয় জটিল পাচার নেটওয়ার্ক। উদ্ধার হওয়া ডায়েরিতে বারবার গর্ভধারণের উল্লেখ, কোথাও নিজেদের ‘মানব ইনকিউবেটর’ বলেও লিখেছেন বেঁচে ফেরা নারীরা।
২০১৯ সালে জেলে আত্মঘাতী হন এপস্টিন। ২০২২ সালে ম্যাক্সওয়েলের ২০ বছরের কারাদণ্ড হয়। ২০২০ সালে গঠিত ক্ষতিপূরণ তহবিল থেকে ১৫০ জনকে ১২ কোটি ডলার দেওয়া হয়েছে।