এখনও পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ সংঘাতে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে। সব পক্ষের আক্রমণের নিন্দা করে কূটনীতি ও সীমান্তে স্থিতিশীলতার উপর জোর দিয়েছে তারা।

কেন পাকিস্তানকে চাইছে সৌদি?
শেষ আপডেট: 22 March 2026 16:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আরব দুনিয়ার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে জল্পনা - ইরানের বিরুদ্ধে কি পাকিস্তানকে যুদ্ধে নামাতে চাইছে সৌদি আরব (Saudi Pakistan Iran conflict)?
সাম্প্রতিক একাধিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, সৌদি আরব নাকি পাকিস্তানকে ২০২৫ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তির (Saudi defence pact Pakistan) কথা মনে করিয়ে দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে চাপ দিচ্ছে। এমনকি কানাডার উদ্দেশে প্রচারিত এক টিভি বার্তার মাধ্যমেও রিয়াধ এই বার্তা (Pakistan Iran war risks) পৌঁছে দিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
কেন পাকিস্তানকে চাইছে সৌদি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবের ভরসা পাকিস্তানের বড় ও যুদ্ধ-অভিজ্ঞ সেনাবাহিনী। বিশেষ করে ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী স্থল অভিযানে সমস্যার মুখে পড়ার পর এই নির্ভরতা আরও বেড়েছে।
২০২৫ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তির ফলে রিয়াধ পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার ‘ছাতার’ নিচে আসতে পারে, এমনটাই ধারণা। এর ফলে আমেরিকার উপর নির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারবে সৌদি।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনা ইরানের পূর্ব সীমান্তে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খুলতে পারে, কিংবা গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী সুরক্ষায় ভূমিকা নিতে পারে। এতে স্থলযুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি এড়াতে পারবে সৌদি বাহিনী।
পাকিস্তানের ঝুঁকি কোথায়?
তবে এই সম্ভাব্য যুদ্ধে পাকিস্তানের ঝুঁকিও কম নয়। শিয়া অধ্যুষিত ইরানের বিরুদ্ধে হামলা হলে পাকিস্তানের ভিতরেই সাম্প্রদায়িক অশান্তি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া জনসংখ্যা রয়েছে পাকিস্তানে, সেই সংখ্যা প্রায় ৩ থেকে ৫ কোটি।
অর্থনীতির দিক থেকেও বিপদ বাড়বে। তেলের দাম বৃদ্ধি, উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে রেমিট্যান্স কমে যাওয়া এবং আগেই চাপের মধ্যে থাকা জ্বালানি ও আর্থিক পরিস্থিতি - সব মিলিয়ে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
নিরাপত্তার দিক থেকেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, ফলে সরাসরি পাল্টা হামলার ঝুঁকি থেকেই যায়। তার উপর ইতিমধ্যেই ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা, আফগানিস্তানে জঙ্গি সমস্যা এবং বালুচ বিদ্রোহ - সব মিলিয়ে একাধিক ফ্রন্টে চাপ সামলাতে হচ্ছে ইসলামাবাদকে।
গোয়েন্দা রিপোর্ট কী বলছে?
ভারতের শীর্ষ গোয়েন্দা সূত্রের মতে, পাকিস্তান যদি সীমিত ভূমিকাও নেয়, যেমন এয়ার ডিফেন্স সাপোর্ট বা সৌদি আরব কিংবা হরমুজ প্রণালীতে সেনা মোতায়েন, তাহলেও কার্যত একটি ‘পশ্চিম ফ্রন্ট’ খুলে যাবে।
এই পরিস্থিতিতে, শিয়া জনসংখ্যা বেশি হওয়ায়, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামলে দেশের ভেতরে অস্থিরতা ও চরমপন্থার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
পাকিস্তানের সম্ভাব্য অবস্থান
সূত্রের খবর, পাকিস্তান পুরো মাত্রায় যুদ্ধে নামবে বা সরাসরি ইরানের মাটিতে সেনা পাঠাবে, এমন সম্ভাবনা কম। ইসলামাবাদের সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো বরং ভারসাম্য বজায় রাখার বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
এখনও পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ সংঘাতে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে। সব পক্ষের আক্রমণের নিন্দা করে কূটনীতি ও সীমান্তে স্থিতিশীলতার উপর জোর দিয়েছে তারা।
কূটনৈতিক বার্তা ও সাম্প্রতিক ইঙ্গিত
২০ মার্চ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই পাকিস্তানকে আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার আহ্বান জানান। এক্স (X)-এ দেওয়া বার্তায় তিনি পাকিস্তানকে “প্রিয় দেশ” বলে উল্লেখ করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারের কথা বলেন।
অন্যদিকে, ১৫ মার্চ পাকিস্তানের একটি তেলবাহী জাহাজ ‘এমটি করাচি’ হরমুজ প্রণালী দিয়ে সফলভাবে অতিক্রম করে, যদিও তখন ওই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ কার্যত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের চাপ, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ - এই তিনের মাঝে দাঁড়িয়ে পাকিস্তান কোন পথে হাঁটবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।