এই উদ্যোগের নেপথ্যে ডঃ শাহিদ রশিদ। সংস্কৃত পড়া নিয়ে অনেকেই তাঁকে প্রশ্ন করেন, হিন্দু ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে যুক্ত একটি ভাষা তিনি কেন শিখছেন?

শেষ আপডেট: 13 December 2025 14:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দেশভাগের পর এই প্রথম, পাকিস্তানের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে ফিরছে সংস্কৃত ভাষা (Sanskrit returns to Pakistan)। লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস (LUMS) সম্প্রতি সংস্কৃত ভাষায় চার ক্রেডিটের একটি কোর্স চালু করেছে। পাকিস্তানে সংস্কৃতচর্চা (LUMS Sanskrit course) পুনরুজ্জীবনের পথে এটি এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বলেই মনে করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছেন ডঃ শাহিদ রশিদ, যিনি ফরম্যান ক্রিশ্চিয়ান কলেজের সমাজবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক। বহু বছর ধরে তিনি সংস্কৃত ভাষা নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করছেন।
দ্য ট্রিবিউন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডঃ রশিদ বলেন, “ধ্রুপদি ভাষাগুলির মধ্যে মানবজাতির জন্য বিপুল জ্ঞান লুকিয়ে রয়েছে। আমি প্রথমে আরবি ও ফারসি শিখি, তার পর সংস্কৃত নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি।” তিনি আরও জানান, তাঁর শেখার বড় অংশই সম্ভব হয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে।
ডঃ রশিদের কথায়, “ধ্রুপদি সংস্কৃত ব্যাকরণ আয়ত্ত করতে আমার প্রায় এক বছর সময় লেগেছে। আর আমি এখনও এই ভাষা শিখেই চলেছি।”
এই সংস্কৃত কোর্সটির সূত্রপাত হয়েছিল একটি তিন মাসের উইকএন্ড ওয়ার্কশপ থেকে। সেই কর্মশালায় ছাত্রছাত্রী ও গবেষকদের মধ্যে বিপুল আগ্রহ দেখা যায়, যার পরেই পূর্ণাঙ্গ কোর্স চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
LUMS-এর গুরমানি সেন্টারের ডিরেক্টর ডঃ আলি উসমান কাসমি জানান, পাকিস্তানে সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে যুক্ত এমন এক বিশাল সম্পদ রয়েছে, যা এখনও প্রায় অনাবিষ্কৃত। দ্য ট্রিবিউন-কে তিনি বলেন, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বিপুল সংখ্যক তালপাতার সংস্কৃত পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে।
ডঃ. কাসমির কথায়, “১৯৩০-এর দশকে গবেষক জে. সি. আর. উলনার এই সংস্কৃত তালপাতার পাণ্ডুলিপিগুলির একটি বড় অংশের ক্যাটালগ করেছিলেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর থেকে কোনও পাকিস্তানি গবেষক এই সংগ্রহ নিয়ে কাজ করেননি। শুধুমাত্র বিদেশি গবেষকরাই এগুলি ব্যবহার করেন। স্থানীয়ভাবে গবেষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে এই চিত্র বদলাবে।”
‘এটাও আমাদেরই ঐতিহ্য’
সংস্কৃত পড়া নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়, একথা স্বীকার করেছেন ডঃ রশিদ। অনেকেই তাঁকে প্রশ্ন করেন, হিন্দু ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে যুক্ত একটি ভাষা তিনি কেন শিখছেন?
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি তাঁদের বলি, আমরা কেন শিখব না? সংস্কৃত গোটা এই অঞ্চলের একটি সংযোগকারী ভাষা। সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ পাণিনির গ্রাম এই অঞ্চলেই ছিল। সিন্ধু সভ্যতার সময় এখানেই বহু লেখা রচিত হয়েছে। সংস্কৃত পাহাড়ের মতো একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতিস্তম্ভ। একে আমাদের নিজের বলে গ্রহণ করতেই হবে। এ কেবল কোনও একটি ধর্মের সঙ্গে যুক্ত নয়, এটাও আমাদেরই।”
ডঃ. রশিদের মতে, সীমান্তের দুই পারে ধ্রুপদি ভাষাচর্চা বাড়লে দক্ষিণ এশিয়ার পারস্পরিক সম্পর্কেও নতুন দিশা খুলতে পারে। তাঁর কথায়, “ভাবুন তো, ভারতে আরও বেশি হিন্দু ও শিখ যদি আরবি শেখেন, আর পাকিস্তানে আরও বেশি মুসলিম যদি সংস্কৃত পড়েন, তাহলে ভাষা বিভাজনের দেওয়াল না হয়ে বরং সেতু হয়ে উঠতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সেটা হতে পারে এক নতুন, আশার শুরু।”
ভাষা বিভাজন নয়, সেতু
দ্য প্রিন্ট-এর একটি পৃথক প্রতিবেদনে ডঃ রশিদের এই যাত্রার আরও ব্যক্তিগত দিক উঠে এসেছে। ৫২ বছর বয়সি এই অধ্যাপকের কাছে ভাষা মানে এক ধরনের সেতু, যার শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে যৌথ ইতিহাসে, আর যার শুরুটা হয়েছিল নিজের বাড়িতেই। তাঁর প্রথম ছাত্রী ছিলেন তাঁর মেয়েই, যিনি এখন দেবনাগরী লিপিতে সাবলীল।
ডা. রশিদ জানান, তাঁর পূর্বপুরুষদের গ্রাম ছিল কর্নালে। আর তাঁর এক দিদিমা এসেছিলেন বর্তমান উত্তরপ্রদেশের শেখপুরা এলাকা থেকে। এই পারিবারিক সূত্রগুলিকেই তিনি দেখেন এমন এক যৌথ সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে, যা ক্রমে রাজনীতি ও সীমান্তরেখায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছে।
দেবনাগরী লিপি নিয়ে নিজের ভালবাসা প্রসঙ্গে ডা. রশিদ বলেন, “দেবনাগরী আমাকে আকর্ষণ করেছিল। লিপিটি ভীষণ শিল্পসম্মত। আমার মতে এই ভাষায় অদ্ভুত গভীরতা রয়েছে।”
গীতা ও মহাভারত পাঠের পরিকল্পনা
এই উদ্যোগ একটি কোর্সেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ডঃ আলি উসমান কাসমির মতে, ভবিষ্যতে LUMS-এ মহাভারত এবং ভগবদ্গীতা নিয়ে কাঠামোবদ্ধ পাঠক্রম (Gita and Mahabharata studies Pakistan) চালু করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, “আগামী ১০–১৫ বছরের মধ্যে পাকিস্তানেই গীতা ও মহাভারত নিয়ে বিশেষজ্ঞ গবেষক তৈরি হতে পারেন।”
সংস্কৃত পাঠক্রমের অংশ হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের সংস্কৃত সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত নানা সাংস্কৃতিক উপাদানের সঙ্গেও পরিচয় করানো হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মহাভারত টেলিভিশন ধারাবাহিকের বিখ্যাত থিম সং ‘হ্যায় কথা সংগ্রাম কি’–র উর্দু রূপান্তর।