দীর্ঘদিন ধরে পুরুষ-প্রধান রাজনীতির দেশে অবশেষে একজন মহিলা নেত্রী শীর্ষ প্রশাসনিক পদে উঠে এলেন, যা জাপানের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করল।

সানায়ে তাকাইচি
শেষ আপডেট: 21 October 2025 16:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বর্তমান শাসকদল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (LDP) তো বটেই জাপানের রাজনীতিতে এ এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। জাপানের প্রাক্তন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি (Sanae Takaichi) মঙ্গলবার দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী (Japan First female PM) হিসেবে নির্বাচিত হলেন।
৫ অক্টোবর LDP-র নেতৃত্বে নির্বাচিত হওয়ার পর, তাকাইচি তাঁর পার্টির মধ্যমপন্থী সহযোগী দলের ২৬ বছরের জোট ভাঙার পর সমর্থন সংগ্রহের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর বড়সড় ব্যয় পরিকল্পনা ও জাতীয়তাবাদী অবস্থান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, বিশেষত শক্তিশালী প্রতিবেশী চিনের সঙ্গে।
৬৪ বছরের তাকাইচি, প্রাক্তন অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী, গত বছর এলডিপির নেতৃত্ব দিতে রান-অফ নির্বাচনে অল্পের জন্য হেরে গিয়েছিলেন। তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাপান সফরে আসছেন, আগামী সপ্তাহেই। সেই জন্য কূটনীতির প্রাঙ্গণে এই বিশেহস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে হবে তাঁকে।
তাকিৎছি ঘোষণা করেছেন, ক্যাবিনেটে নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। তবে সমকামী বিবাহ এবং বিবাহিত দম্পতির স্বতন্ত্র পদবী বিষয়ে তিনি রক্ষণশীল।
তাকাইচি জাপানের শান্তিপ্রিয় পোস্টওয়ার সংবিধান সংশোধনের পক্ষপাতী এবং এই বছর জাপান ও তাইওয়ানের মধ্যে “quasi-security alliance” গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
১৯৯৩ সালে স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে নিম্ন হাউস নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি জাপানের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, ১৯৯৬ সালে LDP-তে যোগ দেন।
কূটনীতিকদের অনেকের মতে, সানায়ে তাকাইচির উত্থান শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্য নয়, বরং জাপানি সমাজ ও রাজনীতির এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। দীর্ঘদিন ধরে পুরুষ-প্রধান রাজনীতির দেশে অবশেষে একজন মহিলা নেত্রী শীর্ষ প্রশাসনিক পদে উঠে এলেন, যা জাপানের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করল। তবে একই সঙ্গে তাঁর কঠোর রক্ষণশীল ভাবমূর্তি জাপানের প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিতর্কও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কাও রয়েছে।
সানায়ে তাকাইচি কে? (Japan - Sanae Takaichi)
কঠোর রক্ষণশীল রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি রয়েছে তাকাইচির (৬৪)। জাপানের প্রাক্তন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মন্ত্রী ছিলেন, তা ছাড়া প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর শিনজো আবে’র ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলেও লোকে তাঁকে চেনেন। তাকাইচি শিনজো আবে’র প্রণীত অর্থনৈতিক নীতি “আবেনোমিক্স”–এর প্রবল সমর্থক। তিনি নিয়মিত ইয়াসুকুনি মন্দিরে যান - দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপানি সামরিক নেতাদের স্মৃতিসৌধ হওয়ায় যা আন্তর্জাতিক বিতর্ক সৃষ্টি করে।
জাপানের নারা প্রিফেকচারের সাকুরাই শহরে তাকাইচির জন্ম ও বেড়ে ওঠা। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম। বাবা ছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। ছোট থেকেই তিনি কঠোর পরিশ্রম ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনে বড় হন। তিনি কোবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন। কলেজ জীবনে থেকেই ছাত্র-রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন।রাজনীতিতে আসার আগে তিনি কিছুদিন পপ-সংগীত শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তরুণ বয়সে গান রেকর্ডও করেছিলেন। তবে পরে রাজনীতিতে প্রবেশ করায় তাঁর সেই স্বপ্ন আর এগোয়নি।
১৯৯৩ সালে প্রথমবার তিনি জাপানের সংসদে (ডায়েট) নির্বাচিত হন তাকাইচি। বিভিন্ন সময়ে তিনি অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রী, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মন্ত্রীসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এলডিপি-র রক্ষণশীল ডানপন্থী শাখার মুখ্য প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত তিনি। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ কঠোর, প্রায়শই বিতর্কিত হলেও তিনি বিশেষ করে যুবক ও রক্ষণশীল ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। জাপানের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী (Japan First female PM) হিসেবে তাঁর এই নির্বাচন শুধু জাপানের রাজনীতিতে নয়, এশীয় রাজনীতিতেও এক বড় মাইলফলক।
তবে প্রধানমন্ত্রী হয়েই তাকাইচিকে বেশ চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। অক্টোবরের শেষে দক্ষিণ কোরিয়ায় এপেক সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জাপানের বৈঠক রয়েছে। সেখানে জাপানের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো নিয়ে চাপ আসবে। জাপানের মুদ্রাস্ফীতি ও বয়স্ক সমাজের সমস্যা মেটাতে তাঁকে নতুন অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করতে হতে পারে। সংবিধান সংস্কার তা শান্তিবাদী ধারা পরিবর্তন করা যাবে কি না, তা নিয়েও তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতার পরীক্ষা হবে।