ভারতের গোলকোণ্ডা খনি থেকে ফরাসি রাজমুকুট পর্যন্ত—৬০ মিলিয়ন ডলারের রিজেন্ট হিরের ইতিহাস রক্ত, বিশ্বাসঘাতকতা ও রাজকীয় গৌরবে ভরা।

ইউরোপের বৃহত্তম ‘রিজেন্ট ডায়মন্ড’।
শেষ আপডেট: 24 October 2025 12:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্যারিসের লুভ জাদুঘরে দুঃসাহসী ডাকাতির ঘটনায় এখনও স্তম্ভিত সারা বিশ্ব। নেপোলিয়নের অমূল্য গয়না-সহ আরও বহুমূল্য সম্পদ নিয়ে উধাও হয়ে গেছে ডাকাতের দল। কিন্তু এত বড় বিপর্যয়ে আশার কথা একটাই, আশ্চর্যজনকভাবে রক্ষা পেয়েছে ৬০ মিলিয়ন ডলারের এক মহামূল্য হিরে, ইউরোপের বৃহত্তম ‘রিজেন্ট ডায়মন্ড’। বহু শতাব্দী আগে এই হিরের উৎপত্তি আবার ভারতের মাটিতেই, অন্ধ্রের খনির গহ্বরে।
রিজেন্ট হিরে: সৌন্দর্যের রাজকীয় প্রতীক
১৪০.৬ ক্যারাট ওজনের এই হিরে সামান্য নীলচে-সবুজ আভার, কুশন-কাটে ঝলমলে। তুলনার জন্য বলা যায়, বিখ্যাত কোহিনূর হিরের ওজন ১০৫.৬ ক্যারাট। এটা তার চেয়েও বড়। ফরাসি রাজপরিবারের সংগ্রহে দীর্ঘদিন ছিল এটি, পরে ১৮৮৭ সালে সেটি লুভ মিউজিয়ামে স্থান পায়।
গোলকোণ্ডার খনি থেকে ইউরোপের রাজদরবারে
রিজেন্ট ডায়মন্ডের যাত্রা শুরু ১৬৯৮ সালে, ভারতের গোলকোণ্ডা খনি থেকে। প্রথমে এর ওজন ছিল ৪২৬ ক্যারাট।
লোকমুখে শোনা যায়, যিনি এই হিরেটি প্রথম খুঁজে পান, তিনি নিজের পায়ের চামড়া কেটে সেই হিরে লুকিয়ে রাখেন, যাতে খনি থেকে গোপনে বের করে আনতে পারেন। পরে তিনি এক নেভি ক্যাপ্টেনের সাহায্য চান, সমুদ্র পেরিয়ে পালানোর জন্য। প্রতিশ্রুতি দেন লাভের অর্ধেক ভাগ দেওয়ার। কিন্তু সেই ক্যাপ্টেনই তাঁকে হত্যা করে হিরেটি দখল করে নেন।
এরপর হিরেটি নজরে আসে তৎকালীন মাদ্রাজ গভর্নর থমাস পিটের। তিনি সেটি বাজেয়াপ্ত করে নেন ওই ক্যাপ্টেনের থেকে। এরপর ইংল্যান্ডে নিয়ে গিয়ে, ১৭০৪ থেকে ১৭০৬ সালের মধ্যে হিরেটি কাটা হয়, এবং ১৭১৭ সালে ফ্রান্সের রিজেন্ট ফিলিপ দ’অরলেয়াঁর অনুরোধে ফ্রান্সে পাঠানো হয়।
তখনই পশ্চিমা দুনিয়ায় রিজেন্ট হিরেকে ‘সবচেয়ে সুন্দর হিরেট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। মাত্র দু’বছরের মধ্যেই এর দাম তিনগুণ বেড়ে যায়। এর কিছু অংশ পরে রাশিয়ার সম্রাট পিটার দ্য গ্রেটের কাছে বিক্রি করা হয়।
রাজমুকুট থেকে টুপির অলংকারে
ফরাসি রাজপরিবারে একের পর এক রাজা-রানির মুকুট ও অলংকারে শোভিত হয়েছে এই হিরে। ১৭২১ সালে লুই পঞ্চদশ এক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে এটি পরে উপস্থিত হন, এবং ১৭২২ সালের অভিষেকে তার মুকুটে বসানো হয়। ১৭২৫ সাল থেকে তিনি নিয়মিত টুপিতে এটি পরতে শুরু করেন, যা তার রাজত্বকাল (১৭৭৪ পর্যন্ত) জুড়েই ছিল।
১৭৭৫ সালে হিরেটি ষোড়শ লুইয়ের মুকুটে স্থান পায়, পরে তা সরিয়ে তাঁর টুপিতে রাখা হয়। এর পর ১৭৯২ সালে এটি চুরি হয়ে যায়, কিন্তু পরের বছর এক ছবির ফ্রেমে লুকানো অবস্থায় উদ্ধার হয়। ফরাসি প্রশাসনের হাতে এটি বহুবার বন্ধক পড়েছিল, অবশেষে ১৮০১ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এটি পুনরুদ্ধার করেন।
প্রথমে এটি তাঁর কনসাল তলোয়ারে, পরে সম্রাট নেপোলিয়নের রাজতলোয়ারে শোভা পায়। সালটা ১৮১২। এর পরেও এই হিরে রাজপরিবারের প্রতীক হয়ে থেকে গেছে, অষ্টাদশ লুই, দশম চার্লস, তৃতীয় নেপোলিয়ন এবং তাঁর স্ত্রী সম্রাজ্ঞী ইউজেনির মুকুটেও এটি শোভা পায়।
অভিশপ্ত হিরে!
প্যারিসের প্রসিকিউটর লর বেকু জানান, কেন ডাকাতরা ৯টি অমূল্য গয়না চুরি করেও রিজেন্ট হিরেটিতে কেন হাত দেয়নি— তা এখনও রহস্য। অনেকে মনে করেন, এই হিরেটি অভিশপ্ত। ডাকাতরাও হয়তো সেটা জেনেই এড়িয়ে গেছে!
কারণ সবার প্রথমে যিনি এটি খনির ভেতর থেকে পাচার করেছিলেন, তিনি নিহত হন। পরবর্তীতে যেসব রাজা ও সম্রাট এই হিরের মালিক ছিলেন, তাঁদের অনেকেরই পরিণতি ভয়াবহ হয়। যেমন লুই ষোড়শ ও মেরি আঁতোয়ানেতকে ফরাসি বিপ্লবের সময় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, আর নেপোলিয়ন বোনাপার্ট নির্বাসিত হন সেন্ট হেলেনা দ্বীপে, যেখানে ১৮২১ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।
আরও এক গোলকোণ্ডা হিরে: ‘হর্টেনসিয়া’
এই ডাকাতিতে চোরেরা আর একটি মূল্যবান হিরেও ফেলে গেছে, ২১.৩২ ক্যারাটের গোলাপি রঙের ‘হর্টেনসিয়া ডায়মন্ড’।
লুই চতুর্দশ এটি কিনেছিলেন, যা ১৭৯২ সালে ফরাসি বিপ্লবের সময় চুরি হয়। পরে পুনরুদ্ধারের পর নেপোলিয়ন প্রথম এটি ব্যবহার করেন। এরপর এটি যায় ডাচ রানি হর্টেন্স দ্য বোহারনিসের কাছে। ১৮৩০ সালে আবার চুরি হলেও পরে ফিরে আসে, এবং লুভের গ্যালারি দ্য আপোলনে সংরক্ষিত হয়।
সে যাই হোক, অন্ধ্রের খনির অন্ধকার গহ্বর থেকে ইউরোপের আলো ঝলমলে রাজপ্রাসাদ— রিজেন্ট হিরের এই দীর্ঘ যাত্রা যেন ইতিহাসের বুক জুড়ে লেখা এক রক্তাক্ত অথচ অনিবার্য সৌন্দর্যের গল্প। সে গল্প আপাতত রক্ষা পেয়ে নিরাপদে রয়েছে লুভে।