দ্য ওয়াল ব্যুরো: মারাত্মক ডবল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রোমের জামেল্লি হাসপাতালের চিকিৎসাধীন পোপ ফ্রান্সিস। ভ্যাটিকানের তরফে জানানো হয়েছে, ৮৮ বছর বয়সি পোপের শারীরিক অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল। সাম্প্রতিক রক্তপরীক্ষায় সংক্রমণের কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত মিলেছে।
পোপ ফ্রান্সিস গত কয়েকদিন ধরে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন এবং এই কারণেই ১৪ ফেব্রুয়ারি তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভ্যাটিকান সূত্রে জানা যায়, তাঁর শরীরে পলিমাইক্রোবিয়াল সংক্রমণ ধরা পড়েছে। একাধিক ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস একসঙ্গে সংক্রমণ ঘটালেই এই সমস্যা দেখা দেয় শরীরে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, জটিল শারীরিক পরিস্থিতির কারণে তাঁকে হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসার অধীনে থাকতে হতে পারে।
কী এই ডবল নিউমোনিয়া?
মুম্বাইয়ের ওকহার্ড হাসপাতালের পালমোনোলজিস্ট ডাঃ ক্যারোলিন সাইমন জানাচ্ছেন, 'ডবল নিউমোনিয়া হল একটি প্রাণঘাতী ফুসফুস সংক্রমণ। এটি দুটি ফুসফুসে একসঙ্গে আক্রমণ করে। এটি সাধারণ নিউমোনিয়ার তুলনায় বেশি বিপজ্জনক। কারণ সাধারণ নিউমোনিয়া শুধুমাত্র একটি ফুসফুসকে সংক্রমিত করে। এটি ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাক দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।'
এই রোগটি মূলত ছোট শিশুদের এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। যাঁদের ফুসফুস সংক্রান্ত রোগ রয়েছে, যেমন ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD) বা ইমফাইসেমা, এবং ধূমপানের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের মধ্যে এই সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।
ডবল নিউমোনিয়ার কারণ
ডাঃ ক্যারোলিন সাইমনের মতে, এই রোগের মূল কারণ হল:
- ব্যাকটেরিয়া: স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনিয়ে, মাইকোপ্লাজমা নিউমোনিয়ে, লেজিওনেলা নিউমোফিলা
- ভাইরাস: ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফ্লু), রেসপিরেটরি সিন্সিশিয়াল ভাইরাস (RSV), কোভিড-১৯
- ফাঙ্গাস: যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাঁদের মধ্যে নিউমোনিয়ার কারণ হতে পারে ফাঙ্গাস, যেমন প্নিউমোসিস্টিস জাইরোভেসি
- অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কারণ: ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, COPD, অ্যাজমা ইত্যাদি রোগ থাকলে ডাবল নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
উপসর্গ
ডাবল নিউমোনিয়ার প্রধান উপসর্গগুলির মধ্যে রয়েছে:
- দীর্ঘস্থায়ী কাশির সঙ্গে কফ (হলুদ, সবুজ বা রক্ত মিশ্রিত)
- বেশি জ্বর, ঠান্ডা লাগা ও অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
- শ্বাসকষ্ট ও দ্রুত শ্বাস নেওয়া
- বুক ব্যথা, যা শ্বাস নেওয়া বা কাশির সময় বাড়ে
- শরীর দুর্বল লাগা ও ক্ষুধামন্দা
- প্রবীণদের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি বা স্মৃতিভ্রংশের লক্ষণ দেখা দিতে পারে
চিকিৎসা পদ্ধতি
ডাঃ সাইমন জানান, এক্সরে, কফ পরীক্ষার রিপোর্ট ও সোয়াব টেস্টের মাধ্যমে ডায়াগনোসিস করা হয়। এর পরে যে যে চিকিৎসা করা হয়:
- অ্যান্টিবায়োটিক: ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে
- অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ: ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে
- অক্সিজেন থেরাপি: গুরুতর সংক্রমণের ক্ষেত্রে
- সহায়ক চিকিৎসা: বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি পান, জ্বর কমানোর ওষুধ ইত্যাদি
- পালমোনারি রিহ্যাবিলিটেশন: কিছু রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী
প্রতিরোধের উপায়
ডবল নিউমোনিয়া প্রতিরোধে ডাঃ সাইমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন—
- ভ্যাকসিন: নিউমোকক্কাল ও ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা নেওয়া
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: নিয়মিত হাত ধোয়া
- ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার: ধূমপান ফুসফুসের ক্ষতি করে, যা নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়
- পর্যাপ্ত পুষ্টি ও শরীরচর্চা: স্বাস্থ্যকর খাবার ও ব্যায়াম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে
- বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার নিয়ন্ত্রণ: অ্যাজমা, COPD বা ব্রঙ্কাইটিস থাকলে সেগুলোর সঠিক চিকিৎসা করানো
- ভিড় এড়িয়ে চলা: বিশেষত যাঁদের ফুসফুসজনিত রোগ রয়েছে, তাঁদের জন্য সংক্রমণ এড়াতে মাস্ক পরা জরুরি
এই অসুখ এড়াতে সঠিক চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাঁদের পূর্ববর্তী ফুসফুসজনিত রোগ রয়েছে, তাঁদের উচিত প্রথম থেকেই উপসর্গগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা।
পোপের স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে আগামী রবিবার পর্যন্ত তাঁর সমস্ত প্রকাশ্য কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে এবং তাঁর অফিসিয়াল শিডিউল স্থগিত রাখা হয়েছে।