প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার ঘোষণা করেছে, তারা খুব শিগগিরই সংসদে ২৭তম সংবিধান সংশোধনী বিল পেশ করবে। এই সংশোধনের ফলে সেনা প্রধান তথা ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের (Asim Munir) ক্ষমতা আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিরোধীরা। অনেকে বলছেন, এই পদক্ষেপ পাকিস্তানকে ফের টেনে নিয়ে যেতে পারে পারভেজ মুশারফের যুগের দিকে—যখন সেনা প্রধানই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে অসামরিক শাসন ব্যবস্থা কার্যত অচল করে দিয়েছিলেন।

শেষ আপডেট: 6 November 2025 13:59
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পাকিস্তানে (Pakistan) সেনাবাহিনীর প্রভাব আরও জোরদার হতে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার ঘোষণা করেছে, তারা খুব শিগগিরই সংসদে ২৭তম সংবিধান সংশোধনী বিল পেশ করবে। এই সংশোধনের ফলে সেনা প্রধান তথা ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের (Asim Munir) ক্ষমতা আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিরোধীরা। অনেকে বলছেন, এই পদক্ষেপ পাকিস্তানকে ফের টেনে নিয়ে যেতে পারে পারভেজ মুশারফের যুগের দিকে—যখন সেনা প্রধানই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে অসামরিক শাসন ব্যবস্থা কার্যত অচল করে দিয়েছিলেন।
বিরোধীদের আশঙ্কা
বিরোধীরা বলছেন, এই পদক্ষেপ আসলে সেনাবাহিনীর প্রভাব আরও মজবুত করার প্রচেষ্টা। প্রাক্তন সিনেটর মুস্তফা নওয়াজ খোখার বলেছেন, “এই সংশোধনীর ফলে নতুন এক কমান্ডার-ইন-চিফ পদ সৃষ্টি হবে, যা দেশের গোটা প্রশাসনিক কাঠামো বদলে দিতে পারে। এতে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে বিপন্ন হবে।” পিপিপি-র সিনেটর রাজা রব্বানি সতর্ক করে বলেছেন, “এই সংশোধনী প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনকে ধ্বংস করবে এবং ২০১০ সালে পাস হওয়া ১৮তম সংশোধনের অর্জনকে নষ্ট করবে।”
আসিম মুনিরের উত্থান
ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুরের’ পর মে মাসে সেনা প্রধান আসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয়। এরপর থেকেই তিনি পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছেন বলে বিশ্লেষকদের মত। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিনি আন্তর্জাতিক আলোচনাতেও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন এবং আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত তাঁর কূটনৈতিক দক্ষতার প্রশংসা করেছেন।
সংশোধনের প্রস্তাব ও মূল উদ্দেশ্য
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ২৭তম সংশোধনীতে সংবিধানের ২৪৩ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদ সেনা প্রধানের নিয়োগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত।এছাড়াও প্রস্তাবে সাংবিধানিক আদালত গঠন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়া সরলীকরণ, এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট পুনর্বহাল, বিচারপতিদের বদলি এবং প্রাদেশিক তহবিলে কেন্দ্রীয় সরকারের অধিক নিয়ন্ত্রণ—এই সমস্ত বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি শিক্ষা ও জনকল্যাণ মন্ত্রককে প্রাদেশিক প্রশাসনের হাত থেকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার কথাও বলা হয়েছে।
সরকারের অবস্থান
পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও বিদেশ মন্ত্রী ইশাক দার সিনেটে বক্তব্য রাখার সময় স্বীকার করেছেন যে, সরকার সত্যিই ২৭তম সংশোধনী আনতে চলেছে। তিনি বলেন, “এই প্রক্রিয়া যথাযথ সাংবিধানিক নিয়ম মেনে করা হবে, কোনও হঠাৎ ভোটাভুটি হবে না।”
সংসদীয় সংখ্যা গণিত
সংবিধান সংশোধনের জন্য জাতীয় পরিষদ ও সিনেটে পৃথকভাবে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। জাতীয় পরিষদে (৩৩৬ আসনের মধ্যে) সরকারের কাছে ২৩৩টি আসন থাকায় সংশোধনী সহজেই পাস হতে পারে। তবে ৯৬ সদস্যের সিনেটে সরকারের সংখ্যা ৬১—তাই অন্তত তিনজন বিরোধী সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে।
মুশারফ যুগের স্মৃতি ফিরে আসছে
এই প্রস্তাবের পর পাকিস্তানের বহু বিশ্লেষক এবং নাগরিকের মনে ভেসে উঠছে পারভেজ মুশারফের আমলের স্মৃতি। ১৯৯৯ সালে সেনা প্রধান হিসেবে মুশারফ প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ শাসন শুরু করেছিলেন। তিনি প্রথমে “অস্থায়ী ব্যবস্থা”র কথা বললেও পরবর্তীতে নিজেই রাষ্ট্রপতির পদে বসেন, সংবিধান স্থগিত করেন এবং বেসামরিক প্রশাসনকে কার্যত সেনার অধীনস্ত করে দেন।তাঁর শাসনকালে পাকিস্তান ‘সামরিক গণতন্ত্র’-এর এক অদ্ভুত কাঠামোয় আবদ্ধ হয়ে পড়ে, যেখানে নির্বাচনের পরেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকত সেনার হাতে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপ এবং জনগণের আন্দোলনের মুখে ২০০৮ সালে তিনি ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন।এখন, আসিম মুনিরের ক্ষমতা বৃদ্ধির এই নতুন উদ্যোগে সেই পুরনো দৃশ্যপটের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছে দেশটির গণতান্ত্রিক মহল। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সবসময়ই প্রভাবশালী—প্রায় অর্ধেক সময় দেশটি সরাসরি সামরিক শাসনের অধীনে থেকেছে। এখন যদি ২৭তম সংশোধনী কার্যকর হয়, তবে সেই আধিপত্য আরও গভীর হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এই পদক্ষেপ কেবল একটি আইন সংশোধন নয়, বরং পাকিস্তানের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে তারই দিকনির্দেশ করবে।