ভারতীয় প্রতিরক্ষা শক্তির ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল শনিবার। উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনউয়ে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি প্রথম ব্যাচের ব্রাহ্মোস (BrahMos) সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উদ্বোধন করলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং

রাজনাথ সিং
শেষ আপডেট: 18 October 2025 14:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় প্রতিরক্ষা শক্তির ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল শনিবার। উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনউয়ে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি প্রথম ব্যাচের ব্রাহ্মোস (BrahMos) সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উদ্বোধন করলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (Rajnath Singh)। সেখান থেকেই পাকিস্তানকে কড়া বার্তা দিলেন রাজনাথ — “পাকিস্তানের প্রতিটা ইঞ্চি এখন ব্রহ্মোসের নাগালের মধ্যে। ‘অপারেশন সিঁদুর’ ছিল শুধু একটি ট্রেলার!”
রাজনাথের কথায়, অপারেশন সিঁদুরের (Operation Sindoor) শুধু একটি সামরিক অভিযান ছিল না, বরং পাকিস্তানের কান মলে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, সীমানা লঙ্ঘনের কোনও চেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না। তিনি বলেন, “জেতাটা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানকে যা বোঝানোর বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাকিটা বলার প্রয়োজন নেই।”
প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, “ব্রহ্মোস মিসাইল কার্যত আমাদের নিরাপত্তার মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে। শত্রুপক্ষ যদি আক্রমণের সাহস দেখায়, তবে তাদের আর রেহাই নেই।”
লখনউয়ের সারোজিনী নগরে ব্রাহ্মোস এয়ারোস্পেসের (BrahMos Aerospace) অত্যাধুনিক ইউনিটে উৎপাদিত হয়েছে এই প্রথম ব্যাচের ক্ষেপনাস্ত্র। ২০২৫ সালের মে মাসে এই ইউনিটের উদ্বোধন হয়েছিল। সেখানেই ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা ও গুণমান যাচাইয়ের জন্য আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই কারখানা থেকে প্রাথমিকভাবে বছরে প্রায় ১৫০টি মিসাইল তৈরির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এই ইউনিট শুধু ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর জন্য নয়, ভবিষ্যতে রপ্তানির জন্যও অস্ত্র তৈরি করবে। এর ফলে উত্তরপ্রদেশ প্রতিরক্ষা শিল্পের এক বড় হাব হয়ে উঠছে।
ব্রহ্মোস মিসাইল হল ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি এক সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল। এর নামকরণ হয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদী ( Brahmaputra River) এবং মস্কোভা ( Moskva River) আদ্যক্ষর নিয়ে। ১৯৯৮ সালে ব্রহ্মোস প্রকল্প শুরু হয় এবং প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ হয় ২০০১ সালে।
এই মিসাইল শব্দের চেয়ে তিনগুণ বেশি গতি তুলতে পারে (প্রায় ম্যাক ২.৮ থেকে ৩ পর্যন্ত)। এটি ২৯০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে ভয়াবহ নির্ভুলতায় আঘাত হানতে সক্ষম। সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছ দিয়ে উড়ে শত্রুর রাডারকে এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এর। তা ছাড়া ব্রাহ্মোসের ওয়ারহেড ২০০ থেকে ৩০০ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে পারে।
ব্রহ্মোসের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি তিনটি প্ল্যাটফর্ম থেকেই উৎক্ষেপণ করা যায়— স্থলভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হয় সেনাবাহিনীর জন্য। সমুদ্রভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম অর্থাৎ যুদ্ধজাহাজ থেকে ছোড়া যায়। আবার যুদ্ধবিমান থেকেও এই মিসাইল লঞ্চ করা যায়।
এই মিসাইল এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে এটি দ্রুত ডিপ্লয়মেন্টের জন্য প্রস্তুত করা যায়। আক্রমণের গতি ও নির্ভুল লক্ষ্যভেদের কারণে এটি বিশ্বের অন্যতম মারাত্মক ক্রুজ মিসাইল বলে মনে করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রহ্মোস ভারতের প্রতিরক্ষা শক্তিতে ‘গেম চেঞ্জার’। পাকিস্তানের প্রতিটি কৌশলগত স্থাপনা এই মিসাইলের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। রাজনাথ সিং তাই স্পষ্ট করে বলেছেন, “এখন শত্রুপক্ষ জানে, কোনও দুঃসাহস দেখালে উত্তরটা খুবই দ্রুত ও ভয়ঙ্কর হবে।”
সম্প্রতি পাকিস্তানের সীমান্তে চালানো অপারেশন সিঁদুরে ব্রহ্মোস মিসাইলের ব্যবহার কার্যত পাকিস্তানের সেনা নেতৃত্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, “এই মিসাইল সিস্টেমের কার্যকরী প্রদর্শন দেখিয়ে দিয়েছে— ভারত তার শত্রুদের কখনও ছাড়বে না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “ব্রহ্মোস শুধু একটি অস্ত্র নয়, এটি আমাদের আত্মনির্ভর ভারতের প্রতীক। আজ ভারত নিজের মাটিতে সবচেয়ে আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। একসময় যা আমরা আমদানি করতাম, আজ সেটাই আমরা রপ্তানি করার অবস্থায়।”
লখনউ ইউনিট চালু হওয়ায় শুধু প্রতিরক্ষা শক্তিতে নয়, অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এই ইউনিট উত্তরপ্রদেশ প্রতিরক্ষা শিল্প করিডরের ছয়টি নোডের মধ্যে একটি। রাজনাথ সিং বলেন, “কয়েক বছর আগে কেউ ভাবতেই পারেনি লখনউয়ের মতো শহর থেকে দেশের সবচেয়ে আধুনিক মিসাইল তৈরি হবে। আজ সেটা বাস্তব।”
তিনি আরও বলেন, “ছোট ও মাঝারি শিল্পকে শক্তিশালী না করলে বিদেশি সংস্থার উপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব নয়। তাই এই প্রকল্প শুধু সেনার জন্য নয়, দেশীয় শিল্পেরও এক বড় জয়।”
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর গলায় এ দিন শুধু গর্ব নয়, ছিল হুঁশিয়ারিও। তিনি বলেন, “প্রতি ইঞ্চি পাকিস্তানের জমি ব্রহ্মোসের নাগালে। অপারেশন সিঁদুর ছিল ট্রেলার মাত্র। এবার যদি সময় আসে, তবে সেই ট্রেলারই ফিচার ফিল্মে পরিণত হবে।” এই বার্তা কার্যত পাকিস্তানের জন্য এক কড়া সতর্কতা— সীমান্তে সন্ত্রাসবাদ বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা হলে ভারত তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাবে।
বিশ্বজুড়ে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা ব্রহ্মোসকে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক সুপারসনিক মিসাইল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। একাধিক দেশ ভারতের সঙ্গে এই মিসাইল কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। ২০২২ সালে ফিলিপিন্সের সঙ্গে প্রথম রপ্তানি চুক্তি হয়। ভবিষ্যতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশ এই মিসাইল কিনতে পারে বলে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
এছাড়াও, ব্রহ্মোসের সাফল্য ভারতকে প্রতিরক্ষা রপ্তানির মানচিত্রে নতুন জায়গা করে দিয়েছে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির অন্যতম সাফল্য বলেই এই প্রকল্পকে দেখা হচ্ছে।
সাউথ ব্লকের কর্তাদের মতে, লখনউয়ে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ব্রহ্মোস মিসাইলের প্রথম ব্যাচ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে ভারত প্রতিরক্ষা আত্মনির্ভরতার পথে এক বিশাল পদক্ষেপ নিল। এই মিসাইল শুধু সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করছে না, শত্রু রাষ্ট্রগুলিকেও পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে— ভারতের উপর হামলা মানেই ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ।