আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর ইরানে উত্তরসূরি নিয়ে জোর জল্পনা। সুপ্রিম লিডারের দৌড়ে এগিয়ে মোজতবা খামেনেই। কেন তাঁর নাম ঘিরে বিতর্ক ও গুরুত্ব—বিস্তারিত প্রতিবেদন।

মোজতাবা খামেনেই।
শেষ আপডেট: 4 March 2026 13:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা (Iran Supreme Leader) আয়াতোল্লা আলি খামেনেই (Ayatollah Ali Khamenei) নিহত হওয়ার পর তেহরানের (Tehran) ক্ষমতার অন্দরমহলে শুরু হয়েছে নতুন সমীকরণ। সেই সমীকরণের কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি নাম— মোজতবা খামেনেই (Mojtaba Khamenei)। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দাবি, ইরানের পরবর্তী সুপ্রিম লিডার হওয়ার দৌড়ে এখন সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন আলি খামেনেইয়ের এই ছেলে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের শক্তিশালী ধর্মীয় পরিষদ অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস ইতিমধ্যেই উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। মঙ্গলবার তাদের বৈঠকে মোজতবা খামেনেইকে “সবচেয়ে শক্তিশালী সম্ভাব্য প্রার্থী” হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে তিনজন ইরানি কর্মকর্তার সূত্রে জানা গেছে। যদিও এখনও চূড়ান্ত ঘোষণা করা হয়নি।
তবে পরিস্থিতি জটিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে দ্রুত তাঁর নাম ঘোষণা করলে তিনি হামলার লক্ষ্য হতে পারেন—এই আশঙ্কাও নাকি প্রকাশ করেছেন কিছু প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা।
৫৬ বছর বয়সি মোজতবা খামেনেইয়ের জন্ম ১৯৬৯ সালে ইরানের মাশহাদ শহরে। তাঁর শৈশব কেটেছে সেই সময়, যখন তাঁর বাবা শাহ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। পরে ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর আলি খামেনেই ধীরে ধীরে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন।
মোজতবা খামেনেই নিজে অবশ্য ইরানের অনেক ধর্মীয় নেতার মতো উচ্চপদস্থ ধর্মতাত্ত্বিক নন। তিনি কখনও কোনও নির্বাচিত পদেও ছিলেন না, সরকারের কোনও আনুষ্ঠানিক পদও তাঁর নেই।
তবু ইরানের ক্ষমতার করিডরে তাঁর প্রভাব অনেক বলেই মনে করা হয়। বিশেষ করে শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)–এর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা প্রায়ই শোনা যায়।
ইরান–ইরাক যুদ্ধে তিনি অংশ নিয়েছিলেন বলেও জানা যায়। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে বাবার দফতরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত হন।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাঁকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রাখে। অভিযোগ ছিল, কোনও সরকারি পদ না থাকলেও তিনি সুপ্রিম লিডারের হয়ে কার্যত প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন।
যদি মোজতবা খামেনেই সত্যিই ইরানের পরবর্তী সুপ্রিম লিডার হন, তবে তা হবে ঐতিহাসিক ঘটনা। কারণ, ইসলামিক রিপাবলিক বরাবরই বংশানুক্রমিক ক্ষমতা বা রাজতন্ত্রের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছে। বাবা থেকে ছেলের হাতে ক্ষমতা যাওয়া শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্যেও খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান বিশেষজ্ঞ আলি নাসরের মতে, মোজতবার উত্থান হলে তা বোঝাবে যে ইরানের শাসনব্যবস্থায় রেভল্যুশনারি গার্ডের কঠোরপন্থী অংশের প্রভাব আরও বাড়ছে।
তাঁর সমর্থকদের মতে, সংকটের সময়ে তিনি আলি খামেনেইয়ের নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবেন। কিন্তু সমালোচকদের আশঙ্কা— এতে ইরানের রাজনীতিতে পারিবারিক উত্তরাধিকারভিত্তিক ক্ষমতার ধারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, দেশের সুপ্রিম লিডার নির্বাচন করে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস—৮৮ সদস্যের একটি পরিষদ, যাদের জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচন করে।
ইসলামিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার পর এবারই মাত্র দ্বিতীয়বার এই পরিষদের সামনে নতুন সুপ্রিম লিডার বেছে নেওয়ার দায়িত্ব এসেছে।
ফলে তেহরানের ক্ষমতার এই লড়াই শুধু ইরানের রাজনীতির জন্যই নয়, আরব দুনিয়ার ভূরাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।