ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণ থেকে নেওয়া শিক্ষার ভিত্তিতেই তিনি এমন একটি সামরিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যা নেতৃত্ব হারালেও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। ফলে দ্রুত বিজয়ের আশা করা শত্রুর সামনে এখন দীর্ঘ, ব্যয়বহুল সংঘর্ষ ছাড়া অন্য পথ নেই।

মেজর জেনারেল মহম্মদ আলি জাফরি
শেষ আপডেট: 13 March 2026 22:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভেবেছিল, ২০০৩ সালে ইরাকে (2003 Iraq war) যা করা সম্ভব হয়েছিল, ২০২৬ সালে ইরানেও একই পন্থা অবলম্বন করা সম্ভব এবং সহজ হয়ে উঠবে ইরানের পরাজয়। ২০০৩ সালে যখন আমেরিকা ইরাকে হামলা চালায়, তখন মাত্র ২৬ দিনের সক্রিয় সামরিক অভিযানের মধ্যেই সাদ্দাম হুসেনের সেনাবাহিনী কার্যত ভেঙে পড়েছিল।
কিন্তু ইরানে এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ খুব মন দিয়ে বিশ্লেষণ করেছিলেন। এবং ঠিক করেছিলেন, সাদ্দাম হুসেনের সাম্রাজ্যের মতো হঠাৎ করে যেন ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে। সেই ব্যক্তিই মেজর জেনারেল মহম্মদ আলি জাফরি (Mohammad Ali Jafari), ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (Islamic Revolutionary Guard Corps)-এর প্রাক্তন প্রধান।
অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’: নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইজরায়েলি বাহিনী যৌথভাবে শুরু করে অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury)। যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চালানো হয় ব্যাপক হামলা।
এই হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই, আইআরজিসি প্রধান মহম্মদ পাকপৌর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদে, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান সেয়াদ আবদোলরহিম মৌসাভি-সহ বহু শীর্ষ কর্মকর্তা।
ওয়াশিংটনের ধারণা ছিল, এই হামলায় ইরানের কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং পাল্টা আঘাতের ক্ষমতা হারাবে দেশটি। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টোটা ঘটেছে। প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ইরান লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, যার অভিঘাতে গোটা আরব দুনিয়া জুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে।
‘ডিসেন্ট্রালাইজড মোজাইক ডিফেন্স’: জাফরির তৈরি যুদ্ধকৌশল (Decentralised Mosaic Defence)
এই প্রতিরোধ সম্ভব হয়েছে মূলত মেজর জেনারেল মহম্মদ আলি জাফরির তৈরি এক বিশেষ সামরিক কৌশলের জন্য - ‘ডিসেন্ট্রালাইজড মোজাইক ডিফেন্স’ (Decentralised Mosaic Defence)। এই কৌশলের মূল ধারণা হল দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব যদি একসঙ্গে ধ্বংসও হয়ে যায়, তবুও যেন সেনাবাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে।
এই ব্যবস্থায় সামরিক ক্ষমতা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বহু আধা-স্বাধীন ইউনিটের মধ্যে। প্রত্যেকটি ইউনিট আগে থেকেই নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বতন্ত্রভাবে কাজ করতে পারে।
হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা আঘাত
২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের একের পর এক হামলা আঘাত হানে মার্কিন ঘাঁটি ও অবকাঠামোয়। বাহরিন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত, জর্ডনের পাশাপাশি ইজরায়েলের অন্দরেও একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিরপেক্ষ দেশগুলিতে হামলার জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন এবং উপসাগরীয় দেশগুলির সার্বভৌমত্বকে সম্মান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তবুও ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ থামেনি। ১৩ মার্চ, যুদ্ধের ১৪তম দিনেও হামলা অব্যাহত ছিল।
ইরানের ব্যাখ্যা: “দুই দশক ধরে প্রস্তুতি”
১ মার্চ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম X-এ ইরানের আব্বাস আরাঘচি এই কৌশল ব্যাখ্যা করেন। তিনি লিখেছিলেন, ইরান গত দুই দশক ধরে আমেরিকার সামরিক ব্যর্থতাগুলি কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছে - একদিকে ইরাক, অন্যদিকে আফগানিস্তান।
তাঁর কথায়, রাজধানীতে বোমা পড়লেও যুদ্ধ চালানোর ক্ষমতা ইরানের কমবে না। কারণ মোজাইক ডিফেন্স ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরান নিজেই ঠিক করবে যুদ্ধ কখন এবং কীভাবে শেষ হবে।
তিনি আরও জানান, ইরানের সামরিক ইউনিটগুলি এখন অনেকটাই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং আগে থেকে নির্ধারিত নির্দেশ মেনে চলছে।
কে এই মহম্মদ আলি জাফরি?
মেজর জেনারেল মহম্মদ আলি জাফরি একজন ইরানি সামরিক কর্মকর্তা, যিনি ইসলামি বিপ্লবের পর ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (Islamic Revolutionary Guard Corps)-এর গোয়েন্দা শাখায় কর্মজীবন শুরু করেন। প্রসঙ্গত, এই বিপ্লবেই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল পালভি রাজত্ব।
জাফরি অংশ নিয়েছিলেন দীর্ঘ ইরান-ইরাক যুদ্ধেও। সেই যুদ্ধের মধ্য দিয়েই ধাপে ধাপে তিনি সেনাবাহিনীর উচ্চপদে পৌঁছন।
১৯৯২ সালে তাঁকে আইআরজিসি-র স্থলবাহিনীর প্রধান করা হয়। পাশাপাশি তিনি দায়িত্ব পান 'সারআল্লাহ' নামের একটি এলিট ইউনিটের, যার কাজ তেহরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
২০০৫ সালে তিনি আইআরজিসি-র সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিস-এর প্রধান হন। সেই সময় থেকেই তিনি নতুন সামরিক মতবাদ নিয়ে কাজ শুরু করেন, যা পরে ‘মোজাইক ডিফেন্স’ নামে পরিচিত হয়।
২০০৭ সালে তাঁকে আইআরজিসি-র সর্বাধিনায়ক করা হয় এবং সেই সময় থেকেই তিনি এই কৌশল বাস্তবায়ন শুরু করেন।
কোন অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি মোজাইক ডকট্রিন?
জাফরির এই কৌশল দুটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি -
১. ইরান-ইরাক যুদ্ধ
এই যুদ্ধ ছিল দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়ক্ষতির লড়াই। ইরাক স্থল আক্রমণ, রাসায়নিক অস্ত্র এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালেও ইরান মানবঢেউ কৌশলে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
বিশেষ করে বিপুল সংখ্যক বাসিজ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী ব্যবহার করে তারা ইরাকি সেনাবাহিনীকে দীর্ঘ যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে। এর ফলে শক্তিশালী ইরাকি বাহিনীও অচলাবস্থায় আটকে যায়। এই কৌশল, অর্থাৎ শক্তিশালী শত্রুকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষে ফেলে ক্লান্ত করে দেওয়া - মোজাইক ডিফেন্সের অন্যতম মূল স্তম্ভ।
২. ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণ
২০০৩ সালে আমেরিকার নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণের সময় দেখা যায়, সাদ্দাম হুসেনের সেনাবাহিনী অত্যন্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের অধীনে ছিল। ফলে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করতে পারত না। এমনকি ডিভিশন পর্যায়ের অফিসাররাও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। এই কেন্দ্রীয় কাঠামোর কারণে মার্কিন বাহিনীর দ্রুত অগ্রগতির সামনে ইরাকি সেনা কার্যত ভেঙে পড়ে।
এই ঘটনাই জাফরিকে বুঝিয়ে দেয়, সামরিক কাঠামোকে বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি।
মোজাইক ডকট্রিন আসলে কী?
২০০৫ সালে প্রথম এই কৌশল তৈরি করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল দুই ধরনের হুমকি মোকাবিলা করা - এক, বিদেশি শক্তির সমর্থনে “সফট রেভলিউশন”, দুই, মার্কিন সামরিক হামলা।
এই পরিকল্পনায় ইরানের সামরিক কাঠামোকে ৩১টি প্রাদেশিক কমান্ডে ভাগ করা হয়। প্রতিটি প্রদেশে এক একটি প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ সামরিক কমান্ড তৈরি করা হয়।
এই কমান্ডগুলির রয়েছে,
প্রয়োজনে কেন্দ্রের অনুমতি ছাড়াই তারা নির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী অভিযান চালাতে পারে।
জার্মান যুদ্ধকৌশলের ছায়া
এই ব্যবস্থা অনেকটা জার্মান সেনাবাহিনীর অউফট্র্যাগস্ট্যাকটিক (Auftragstaktik) কৌশলের মতো। এখানে অধস্তন অফিসারদের হাতে স্বাধীনতা থাকে, উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষ কেবল লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়, কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি নির্ধারণ করেন মাঠের কমান্ডাররা।
২০২৬ সালের যুদ্ধে মোজাইক ডিফেন্সের বাস্তব প্রয়োগ
তেহরান এই সংঘর্ষকে বলছে ২০২৬ রামাদান যুদ্ধ। যুদ্ধের প্রথম ঘণ্টাতেই ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হলেও দেশের ৩১টি প্রাদেশিক কমান্ড দ্রুত পাল্টা আক্রমণ শুরু করে।
এই আক্রমণে লক্ষ্যবস্তু হয়েছে,
এমনকি উপসাগরীয় বহু দেশে এই হামলার প্রভাব পড়েছে।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ফারজিন নাদিমি বলেছেন, প্রতিটি প্রদেশ এক একটি “মোজাইক”। তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও স্থানীয় কমান্ডাররা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
অস্ট্রেলিয়া-ভিত্তিক লেখক শনকা আনসলেম পেরেরা-র মতে, ইরান আত্মঘাতী অভিযানে যায়নি, বরং একপ্রকার ‘অটোপাইলট’ মোডে চলছে। তাঁর কথা, মোজাইক ডকট্রিনের লক্ষ্য জেতা নয়, বরং হারকে অসম্ভব করে তোলা।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভান্ডার এবং আইআরজিসি-র মতাদর্শগত দৃঢ়তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে মেজর জেনারেল মহম্মদ আলি জাফরির তৈরি মোজাইক ডিফেন্স ডকট্রিনের।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণ থেকে নেওয়া শিক্ষার ভিত্তিতেই তিনি এমন একটি সামরিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যা নেতৃত্ব হারালেও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। ফলে দ্রুত বিজয়ের আশা করা শত্রুর সামনে এখন দীর্ঘ, ব্যয়বহুল সংঘর্ষ ছাড়া অন্য পথ নেই।