১৯৫৩ সালের প্রথম সফল এভারেস্ট অভিযানের (Everest Expedition) শেষ জীবিত সদস্য কাঞ্চা শেরপা (Kancha Sherpa) ৯২ বছর বয়সে কাঠমান্ডুতে মারা গেলেন। তেনজিং নোরগে (Tenjing Norgay) ও এডমন্ড হিলারির (Edmund Hillary) ঐতিহাসিক অভিযানের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন তিনি।

কাঞ্চা শেরপা।
শেষ আপডেট: 17 October 2025 18:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৫৩ সালের সেই ঐতিহাসিক এভারেস্ট অভিযানের শেষ জীবিত সদস্য কাঞ্চা শেরপা প্রয়াত হলেন। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ২টোর দিকে নেপালের কাঠমান্ডুতে নিজের বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। তাঁর পরিবার জানিয়েছে, জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছিলেন নামচে বাজারে, যা এভারেস্টের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত।
নেপাল মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের (এনএমএ) সভাপতি ফুর গ্যালজে শেরপা বলেন, “আমরা গভীরভাবে শোকাহত কাঞ্চা শেরপার প্রয়াণে। তিনি ১৯৫৩ সালের প্রথম সফল এভারেস্ট অভিযানের শেষ জীবিত সদস্য ছিলেন। নেপালের পর্যটন জগত আজ এক কিংবদন্তিকে হারালো। তাঁর অনুপস্থিতি এক অপুরণীয় শূন্যতা তৈরি করেছে।”
১৯৩২ সালে নামচেতে জন্ম নেওয়া আং ফুরবা ‘কাঞ্চা’ শেরপা মাত্র ১৯ বছর বয়সে পর্বতারোহণে পা রাখেন। কাজের সন্ধানে একদিন চুপিসারে বাড়ি ছেড়ে দার্জিলিংয়ে চলে যান। সেখানেই তাঁর দেখা হয় কিংবদন্তি তেনজিং নোরগের সঙ্গে। তেনজিং তাঁকে চিনে ফেলেন— কারণ কাঞ্চার বাবা ১৯৫২ সালের তিব্বতের এভারেস্ট অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। তরুণ কাঞ্চার উদ্যমে মুগ্ধ হয়ে তেনজিং তাঁকে সাহায্য করেন ১৯৫৩ সালে স্যার এডমন্ড হিলারির অভিযানে যোগ দিতে। সে দলে ছিলেন ১০৩ জন শেরপা। তাঁদেরই একজন কাঞ্চা। তিনি প্রতিদিন পাঁচ টাকা মজুরি পেতেন।

অভিযানের পর তিনি ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্বতারোহণ অভিযানে কাজ চালিয়ে যান। পরে অবসর নেন। তবে থেমে থাকেননি। পরবর্তীতে ট্রেকিং গ্রুপের সঙ্গে কাজ করে বহু পর্যটককে হিমালয়ের পথে পথপ্রদর্শন করেছেন, যদিও আর উচ্চতর শৃঙ্গে ওঠেননি।
হিলারি ও তেনজিংয়ের সঙ্গে তিনি যদিও এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছাতে পারেননি, তবে অভিযানের সাফল্যে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পৌঁছেছিলেন শেষ ক্যাম্প পর্যন্ত— যা আজকের ‘সাউথ সামিট’।
২০২০ সালে নেপালের সরকারি সংবাদ সংস্থা রাষ্ট্রীয় সংবাদ সমিতি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাঞ্চা স্মৃতিচারণা করেন সেই ঐতিহাসিক অভিযানের দিনগুলোর। তিনি বলেন, “আমরা ভক্তপুর থেকে রওনা দিয়েছিলাম ৩৫ জন আরোহী ও প্রায় ৪০০ জন বাহক নিয়ে। প্রতিদিন ১০০ জন করে দলের সদস্য ভারী বোঝা বহন করত পায়ে হেঁটে। তখন কোনও রাস্তা ছিল না, হোটেল তো দূরের কথা। কাঁচা রাস্তায় হাঁটা আর ভাজা ভুট্টাই ছিল খাবার।”

দলটি ১৬ দিনে পৌঁছায় নামচে বাজারে। সেখান থেকে কেবল আরোহী ও স্থানীয় শেরপারাই এগিয়ে যান, ইয়াকের পিঠে মালপত্র বহন করে আর ৬ দিন পর পৌঁছান এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে। কাঞ্চা জানান, তাঁদের সঙ্গে ছিল ২৫টি বস্তা ভর্তি টাকা—অভিযানের ব্যয় মেটানোর জন্য!
সবচেয়ে কঠিন অংশ ছিল ক্যাম্প ১ পর্যন্ত পথ তৈরি করা। খুম্বু আইসফলে পৌঁছে তাঁরা পড়েন এক বিশাল ফাটলের মুখে, যা পেরোনোর কোনো উপায় ছিল না। “আমাদের কাছে কোনো মই ছিল না,” বলেন কাঞ্চা। “তাই আমরা ফিরে গিয়ে নামচে থেকে দশটা পাইনগাছ কেটে এনেছিলাম, আর সেই গাছ দিয়ে বানিয়েছিলাম কাঠের সেতু।”

তখনও এভারেস্টকে নেপালি ভাষায় ‘সাগরমাথা’ বলা শুরু হয়নি। স্থানীয়রা তাকে চিনত ‘চোমোলুংমা’ নামে। পরে, যখন চতুর্থ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়, স্যার এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগে শুরু করেন চূড়ান্ত আরোহণ। ১৯৫৩ সালের ২৯ মে দুপুর প্রায় ১টার দিকে রেডিও বার্তা আসে, তাঁরা সফল। কাঞ্চা তখনকার মুহূর্ত স্মরণ করে বলেছিলেন, “আমরা নাচছিলাম, সবাই সবাইকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছিলাম। ছিল খাঁটি আনন্দের মুহূর্ত।”
অভিযানে তিনি চুড়োয় না পৌঁছলেও, তাঁর অবদান ছিল অমূল্য। কাঞ্চা শেরপা শুধু এক আরোহী ছিলেন না, তিনি ছিলেন ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। সেই দলের শেষ কণ্ঠস্বর, যারা মানবজাতির সীমা ভেঙে পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছিল।