অক্টোবরের মাঝামাঝি সংসদীয় ভোটে তাকাইচিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হলে, তিনি হবেন জাপানের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী (Japan First female PM)। এটি শুধু জাপানের রাজনীতিতে নয়, এশীয় রাজনীতিতেও এক বড় মাইলফলক।
.jpeg.webp)
শেষ আপডেট: 4 October 2025 14:06
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জাপানের শাসকদল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি)–র নেতৃত্বের নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত ঘটল। শনিবার দলের নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত হলেন প্রাক্তন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি (Sanae Takaichi)। তিনি যদি সংসদীয় ভোটে সমর্থন পান, তবে তাকাইচি হতে চলেছেন জাপানের ইতিহাসের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী (Japan First Female PM)।
শনিবার এলডিপি নেতৃত্বের ভোটে তাকাইচি মোকাবিলা করেন কৃষি মন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমির সঙ্গে, যিনি আবার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জুনিচিরো কোইজুমির ছেলে। প্রথম দফার ভোটে তাকাইচি পান ১৮৩ ভোট, কোইজুমি পান ১৬৪ ভোট। সংখ্যাগরিষ্ঠতা না মেলায় দ্বিতীয় দফা রান-অফ ভোটে সিদ্ধান্ত হয়। প্রায় ২৯৫ জন সংসদ সদস্য এবং প্রায় ১০ লক্ষ এলডিপি সদস্য ভোটে অংশ নেন। সেই ভোটে তাকাইচি জয়ী হন এবং দলের সর্বসম্মত নেতা নির্বাচিত হন। অক্টোবরের মাঝামাঝি সংসদে তাঁর প্রধানমন্ত্রী পদে আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের ভোট হবে।
কূটনীতিকদের অনেকের মতে, সানায়ে তাকাইচির উত্থান শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্য নয়, বরং জাপানি সমাজ ও রাজনীতির এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। দীর্ঘদিন ধরে পুরুষ-প্রধান রাজনীতির দেশে অবশেষে একজন মহিলা নেত্রী শীর্ষ প্রশাসনিক পদে উঠে আসছেন—যা জাপানের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করবে। তবে একই সঙ্গে তাঁর কঠোর রক্ষণশীল ভাবমূর্তি জাপানের প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিতর্কও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কাও রয়েছে।
সানায়ে তাকাইচি কে? (Japan - Sanae Takaichi)
তাকাইচিক বয়স ৬৪ বছর। তিনি বর্তমান শাসক দলের দীর্ঘদিনের নেত্রী শুধু নন, কঠোর রক্ষণশীল রাজনীতিক বলে পরিচিত। জাপানের প্রাক্তন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মন্ত্রী ছিলেন, তা ছাড়া প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর শিনজো আবে’র ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলেও লোকে তাঁকে চেনেন। তাকাইচি শিনজো আবে’র প্রণীত অর্থনৈতিক নীতি “আবেনোমিক্স”–এর প্রবল সমর্থক। তিনি নিয়মিত ইয়াসুকুনি মন্দিরে যান—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপানি সামরিক নেতাদের স্মৃতিসৌধ হওয়ায় যা আন্তর্জাতিক বিতর্ক সৃষ্টি করে। রানঅফ ভোটের আগে বক্তৃতায় তাকাইচি বলেন—“দেশের নানা প্রান্ত থেকে কড়া মন্তব্য উড়ে আসছিল, মানুষ বলছিল তারা জানে না এলডিপি আসলে কীসের পক্ষে। আমি চেয়েছিলাম মানুষ যে দুশ্চিন্তা করছে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, সেই দুশ্চিন্তাকে আশায় রূপান্তর করতে।”
জাপানের নারা প্রিফেকচারের সাকুরাই শহরে তাকাইচির জন্ম ও বেড়ে ওঠা। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম। বাবা ছিলেন স্থানীয় ব্যবসায়ী, মা গৃহিণী। ছোট থেকেই তিনি কঠোর পরিশ্রম ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনে বড় হন। তিনি কোবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন। কলেজ জীবনে থেকেই ছাত্র-রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন।রাজনীতিতে আসার আগে তিনি কিছুদিন পপ-সংগীত শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তরুণ বয়সে গান রেকর্ডও করেছিলেন। তবে পরে রাজনীতিতে প্রবেশ করায় তাঁর সেই স্বপ্ন আর এগোয়নি।
১৯৯৩ সালে প্রথমবার তিনি জাপানের সংসদে (ডায়েট) নির্বাচিত হন তাকাইচি। বিভিন্ন সময়ে তিনি অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রী, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা মন্ত্রীসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এলডিপি-র রক্ষণশীল ডানপন্থী শাখার মুখ্য প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত তিনি। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ কঠোর, প্রায়শই বিতর্কিত হলেও তিনি বিশেষ করে যুবক ও রক্ষণশীল ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। অক্টোবরের মাঝামাঝি সংসদীয় ভোটে তাকাইচিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হলে, তিনি হবেন জাপানের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী (Japan First female PM)। এটি শুধু জাপানের রাজনীতিতে নয়, এশীয় রাজনীতিতেও এক বড় মাইলফলক।
তবে প্রধানমন্ত্রী হয়েই তাকাইচিকে বেশ চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। অক্টোবরের শেষে দক্ষিণ কোরিয়ায় এপেক সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জাপানের বৈঠক রয়েছে। সেখানে জাপানের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো নিয়ে চাপ আসবে। জাপানের মুদ্রাস্ফীতি ও বয়স্ক সমাজের সমস্যা মেটাতে তাঁকে নতুন অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করতে হতে পারে। সংবিধান সংস্কার তা শান্তিবাদী ধারা পরিবর্তন করা যাবে কি না, তা নিয়েও তাঁর রাজনৈতিক দক্ষতার পরীক্ষা হবে। আপাতত, ৪ অক্টোবর ২০২৫ জাপানের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে এক ঐতিহাসিক তারিখ হয়ে রইল—যেদিন সানায়ে তাকাইচি প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দোরগোড়ায় পৌঁছালেন।