দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এ পর্যন্ত ব্যবহৃত পরমাণু বোমা একবারই প্রয়োগ করা হয়েছে। সেটাও ‘দাদাগিরি’ দেখাতে করে দেখিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে হল রিপাবলিকান দলের নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে।
শেষ আপডেট: 25 June 2025 12:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভিয়েতনাম, ইরাক, আফগানিস্তানের পর ইরান। বারবার দেশের স্বার্থবিরোধী যুদ্ধে নেমে একের পর একবার নাকে ঝামা ঘষা খেয়ে ঘরে ঢুকে গিয়েছে আমেরিকা। কোথাওই বিশাল পরিমাণ ডলারের ক্ষতি, সেনার মৃত্যু ও মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া ছাড়া তেমন লাভের গুড় ঘরে তুলতে পারেনি ওয়াশিংটনের দেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এ পর্যন্ত ব্যবহৃত পরমাণু বোমা একবারই প্রয়োগ করা হয়েছে। সেটাও ‘দাদাগিরি’ দেখাতে করে দেখিয়েছে মার্কিন প্রশাসন।
কোনও সময় জর্জ বুশ তো কোনও সময় জো বাইডেন অথবা ডোনাল্ড ট্রাম্প, আমেরিকার গদিতে থাকলেই নিজেদের মনে করেন পৃথিবীর ক্ষমতা তাঁদের মুঠোর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু, প্রতিবারই যুদ্ধে গিয়ে কিংবা সংঘর্ষে লাফ মেরে জড়িয়ে পড়ে ভিতরে-বাইরে দু-কান কাটা হয়ে হোয়াইট হাউসের ভিতর সেঁদিয়ে যেতে হয়েছে শাসকদলকে। এবারেও ইরানের বিরুদ্ধে খামোকা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে ২ দিনের মধ্যে ‘আত্মঘাতী গোলে’ (ভূগর্ভস্থ ৩টি ইরানি পরমাণু কেন্দ্রে বাঙ্কার বিধ্বংসী বোমার ব্যর্থতা) হেরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে হল রিপাবলিকান দলের নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে।
ভিয়েতনামকে ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা লাভের পর দুটি অংশে ভাগ করা হয়। উত্তর ভিয়েতনামের নেতৃত্বে ছিলেন হো চি মিন, যিনি কমিউনিস্ট ছিলেন। দক্ষিণ ভিয়েতনামের নেতৃত্বে ছিল অ-কমিউনিস্ট সরকার, যাদের যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করত। ভিয়েতনাম যুদ্ধের মূল কারণ ছিল ভিয়েতনামকে দুটি অংশে বিভক্ত করা- কমিউনিস্ট উত্তর ভিয়েতনাম এবং অ-কমিউনিস্ট দক্ষিণ ভিয়েতনাম। এই বিভাজন এবং মার্কিন পুঁজিবাদ ও কমিউনিস্ট সোভিয়েতের ঠান্ডাযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে উভয় অংশের মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়। যুদ্ধের ফলে উভয় পক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং অবশেষে মার্কিন সেনার আগ্রাসন থেকে দেশকে মুক্ত করে কমিউনিস্টরা জয়ী হয়।

আমেরিকা মনে করত যে, দক্ষিণ ভিয়েতনাম যদি কমিউনিস্টদের হাতে চলে যায়, তবে এটি পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সাম্যবাদের বিস্তার ঘটাবে। তাই, তারা দক্ষিণ ভিয়েতনামকে রক্ষা করতে চেয়েছিল। ১৯৭৫ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের পতন ঘটে এবং ভিয়েতনাম একটি কমিউনিস্ট দেশ হিসাবে একীভূত হয়।
আমেরিকা এই যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি শিকার হয়, যার মধ্যে ছিল প্রচুর সৈন্য ও সম্পদের অপচয়। যার মধ্যে ছিল অসামরিক মানুষের উপর আক্রমণ এবং রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার। এই যুদ্ধ আমেরিকার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ইরানের মতোই ইরাক-আমেরিকা যুদ্ধের প্রধান কারণ ছিল সাদ্দাম হুসেন নেতৃত্বাধীন ইরাকে গণবিধ্বংসী (পরমাণু) অস্ত্রের মজুত এবং সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের অভিযোগ, যা আমেরিকাকে ২০০৩ সালে দেশটিতে আক্রমণের দিকে নিয়ে যায়। যুদ্ধের ফলাফল ছিল ইরাকের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সম্পূর্ণ পরিবর্তন এবং ইসলামিক স্টেটের (IS) উত্থান, যা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে যে ইরাকের কাছে WMD (Chemical, Biological, and Nuclear weapons) রয়েছে এবং এটি বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এই যুক্তিতেই ইরাকে আক্রমণ করে আমেরিকা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৎকালীন ইরাকি স্বৈরতান্ত্রিক শাসক সাদ্দাম হুসেনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের অভিযোগ আনে এবং এই যুক্তিতেই আগ্রাসন চালায়।

ফলাফল
১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে প্রবেশ করে, যা দেশটিতে গৃহযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের সূচনা করে। অন্যদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মুজাহিদিনদের সমর্থন করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা আফগানিস্তানে প্রবেশ করে। তাদের প্রত্যক্ষ অর্থ সাহায্য, মদত ও রসদে পুষ্ট হয়ে ওঠে ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বাধীন আল কায়েদা গোষ্ঠী। যারা প্রথমে সোভিয়েতকে বিতাড়িত করে এবং পরে মার্কিন চাল বুঝতে পেরে কাবুল থেকে মার্কিন হস্তক্ষেপ ও পুতুল সরকার হটানোর ডাক দেয়। তখন আমেরিকাই আল কায়েদাকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে।

যার পরিণামে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের জঙ্গি হামলার পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আল কায়েদা ও তালিবানকে লক্ষ্য করে আফগানিস্তানে আক্রমণ করে। ২০০১ সালের পর আফগানিস্তান থেকে বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের পর তালিবান পুনরায় ক্ষমতা দখল করে। অর্থাৎ সামাজিক বিভাজন ছাড়া আমেরিকার তেমন কোনও শিকে ছেঁড়েনি। এবং দেশটিকে এক তলানির দিকে ঠেলে দিয়ে সেনা গুটিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছে আমেরিকা।
ইরানের বিরুদ্ধেও ইজরায়েলের অভিযোগ, তেহরাণ পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে। যদিও ইরান শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে, তারা নিরস্ত্র পরমাণু কর্মসূচি অর্থাৎ পরমাণু শক্তি বা বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করছে। যাতে সহযোগিতা করছে রাশিয়া সহ অন্যান্য শুভানুধ্যায়ী দেশ। পুতিনের দাবি অনুযায়ী, ইরানে হামলা করতে ইহুদি রাষ্ট্র ইজরায়েলকে উসকানি দিয়েছে আমেরিকাই। গত ১২ দিন ধরে অবিরাম ইরান-ইজরায়েল পারস্পরিক হামলা-পাল্টা হামলার জেরে বেশ কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু, নিট ফল হিসেবে ইরানের পরমাণু কেন্দ্রের কোনও ক্ষতি করতে পারেনি আমেরিকা। এমনকী গোড়া থেকেই খামেনেইর শাসনের পতনের যে দাবি করে এসেছিল তাও পূরণ হয়নি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প গোড়া থেকেই ফাঁপা আওয়াজ দিয়ে আসর গরম করার চেষ্টা করছিলেন, তা ধরা পড়ে তাঁর দেশেও। সরকারি দল রিপাবলিকান ও বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা ছাড়াও সাধারণ মানুষও আমেরিকা জুড়ে প্রবল বিক্ষোভে জড়ো হতে শুরু করেন। কারণ, মার্কিন নাগরিকদের দাবি, ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘর্ষে জড়ালে আমেরিকার লাভ কী হবে? যেমনটা ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধেও হয়নি।
১২ দিনের যুদ্ধে ইজরায়েলের নিশানাবাজ হানায় ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ও পরমাণু বিজ্ঞানী খতম হয়েছেন। এটা যেমন সত্যি! তেমনই ইরানি হানায় ইজরায়েলের মোসাদ চরগোষ্ঠীর বেশ কয়েকটি দফতর ও সেনা দফতর চুরমার হয়ে গিয়েছে। গুঁড়িয়ে গিয়েছে টেকনোলজি পার্ক। এমনকী ইজরায়েলের আকাশবর্ম বলে বিখ্যাত আয়রন ডোম, অ্যারো ও ডেভিডস স্লিঙ্গ-এর ভাঁড়ার খতম হয়ে আসায় ইরানি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে অকেজো করতে পারছিল না জেরুজালেম। বিশেষত সিয়া মুসলিম ধর্মনেতা খামেনেই এই যুদ্ধকে ইহুদি বিনাশী অর্থাৎ আপামর খ্রিস্টান বিরোধী যুদ্ধ বলে ঘোষণা করায় বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন বাহিনী ও অন্যান্য দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা বিপদের মুখে পড়ে। যার পরিণতিতে কাতার, সিরিয়ায় জঙ্গি গোষ্ঠী ও ইরানি বাহিনী হামলা শুরু করে।

এইভাবে একের পর এক জায়গায় উপযাচক হয়ে নাক গলাতে গিয়ে অসংখ্যবার নাক কেটেছে হোয়াইট হাউসের। কখনও তেলের সাম্রাজ্য দখলে নিয়ে আসতে, কখনও কমিউনিস্ট-পুঁজিবাদী ক্ষমতার দ্বন্দ্বে, কখনও জঙ্গি-পরমাণু অস্ত্রের অজুহাতে নিজের ক্ষমতা দেখাতে গিয়ে কোমরের কষি আলগা হয়েছে আমেরিকার। এবারেও ইরানকে মোক্ষম জবাব দিতে গিয়ে আচমকা যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইজরায়েলের তো বটেই নিজেরও রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা উলঙ্গ হয়ে গিয়েছে ওয়াশিংটন প্রশাসনের।