কূটনৈতিক মহলের অনেকেই মনে করছেন পাকিস্তানের গায়ে পড়ে এমন উদ্যোগের আসল কারণ ভারতের বিরুদ্ধে ইসলামিক দেশগুলির বোঝাপড়াকে আরও মজবুত করা এবং নিজেদের গুরুত্ব তুলে ধরা।

শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানে বৈঠক
শেষ আপডেট: 1 April 2026 08:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইরানের সঙ্গে ইজরায়েল ও আমেরিকার চলমান যুদ্ধ (Iran Israel US Conflicts) থামাতে পাকিস্তানের আমন্ত্রণে ইসলামাবাদে (Islamabad) চার ইসলামিক দেশের বিদেশ মন্ত্রীদের দু'দিনের বৈঠক শেষ হয়েছে। বৈঠকে মিশরের বদর আবদেলাত্তি, সৌদি আরবের ফয়সাল বিন ফারহান, তুরস্কের হাকান ফিদান এবং আমন্ত্রণকারী দেশ পাকিস্তানের (Pakistan) বিদেশ মন্ত্রী তথা উপ প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার উপস্থিত ছিলেন।
দুদিনের বৈঠক শেষ করেই পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রী বেজিং উড়ে যান। সেখানে চিনের বিদেশ মন্ত্রী ওয়াং ই'র সঙ্গে বৈঠকের পর দু'দেশের তরফে ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইজরায়েলের চলমান সংঘাত থামাতে পাঁচ দফা প্রস্তাব গৃহীত হয়।
পাকিস্তানের এই তৎপরতা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে জোর চর্চা চলছে। এর আগে পাক সেনাপ্রধান আসিম মুনির মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে (Donald Trump) ফোন করে যুদ্ধ বিরতিতে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দেন। একই প্রস্তাব দেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ (Shehbaz Sharif)। ইসলামাবাদের তরফে কূটনৈতিক স্তরে দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তানের রাজধানীতে ইরান এবং ইজরায়েল ও আমেরিকার শান্তি বৈঠক চলছে।

বেজিংয়ে বৈঠক ইপাকিস্তান ও চিনের বিদেশ মন্ত্রীরা
যদিও ওই তিন দেশের তরফে এই দাবির সত্যতা স্বীকার করা হয়নি। এমনকী ইরান পাকিস্তানের তৎপরতাকে 'লোক দেখানো, চটকদারি' উদ্যোগ বলে মন্তব্য করেছে।
কূটনৈতিক মহলের অনেকেই মনে করছেন পাকিস্তানের গায়ে পড়ে এমন উদ্যোগের আসল কারণ ভারতের বিরুদ্ধে ইসলামিক দেশগুলির বোঝাপড়াকে আরও মজবুত করা এবং নিজেদের গুরুত্ব তুলে ধরা।
চলতি বছরের মে মাসে অপারেশন সিঁদুরে (Operation Sindoor) ভারতের কাছে পর্যুদস্ত হওয়ার পর থেকেই ন্যাটোর সামরিক জোটের মতো ইসলামিক দেশগুলিকে নিয়ে জোট গঠনের তৎপর হয়ে উঠেছে ইসলামাবাদ। এই উদ্যোগে তারা নতুন মিত্র হিসেবে মিশরকে যুক্ত করতে চাইছে।
অপারেশন সিঁদুরের (Operation Sindoor) সময় চিনের পাশাপাশি তুরস্কও পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা দিয়েছে। আর্থিকভাবে পঙ্গু পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বিরতির আর্জি জানিয়ে সংঘাত থামালেও ভারতের বিরুদ্ধে সামরিক জোট তৈরিতে প্রবল উৎসাহে নেমে পড়ে। চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদির সঙ্গে স্বাক্ষরিত কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বলা হয়, সৌদি আরব ও পাকিস্তান যে কোনও এক দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণকে দু দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। রিয়াদে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি অনুযায়ী, পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তান সৌদি আরবকে সামরিক নিরাপত্তা দেবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যখন আরব দুনিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে নয়া মাত্রা দিতে সচেষ্ট তখন সৌদির সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক চুক্তি নয়া দিল্লির জন্য যথেষ্ট অস্বস্তি এবং চিন্তার কারণ হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতে জঙ্গি তৎপরতা চালানোর যে অভিযোগ নয়া দিল্লি করে আসছে তাও আন্তর্জাতিক মঞ্চে কিছুটা হলেও ধাক্কা খাবে, পাকিস্তান সৌদিকে পাশে পেয়ে যাওয়ায়। ইরান ইস্যুকে হাতিয়ার করে পাকিস্তান এই সুযোগে আরও একবার ইসলামিক দেশগুলির মধ্যে বোঝাপড়া মজবুত করে নিচ্ছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের ধারণা। এই প্রক্রিয়ায় ইসলামাবাদের বেইজিংকে যুক্ত করার তৎপরতাও কূটনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ইরান ইস্যুতে গোড়া থেকে চিন খানিক হাত গুটিয়ে আছে। ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইজরায়েলের একতরফা হামলায় বেইজিংয়ের তরফে প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া মেলেনি বলে কূটনৈতিক ও সামরিক মহল মনে করে থাকে। পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রীর ইসলামিক দেশগুলি সঙ্গে বৈঠক শেষে বেজিং যাওয়ার পিছনে চলতি পরিস্থিতিতে চিনের গুরুত্বকে বড় করে দেখানোর প্রচেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন চলতি পরিস্থিতিতে নয়া দিল্লির নীরবতা ও দৃশ্যত নিষ্ক্রিয়তা ইসলামাবাদকে বাড়তি সুবিধা করে দিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ থামাতে আন্তরিক প্রয়াস চালিয়েছেন। ওই দুই দেশই মোদীর উদ্যোগের প্রশংসা করে। কিন্তু ইরান ইস্যুতে ভারত কোনও বাড়তি উদ্যোগ নিচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী মোদী ইরান ও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শুধু টেলিফোনে শান্তি ফেরানোর আর্জি জানিয়েছেন। কোনও কোনও মহলের ধারণা, নয়াদিল্লিকে নিষ্ক্রিয় রাখতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদকে পরোক্ষে উৎসাহ যোগাচ্ছে শান্তি প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে।
পাকিস্তানের তৎপরতা এবং নয়া দিল্লির নীরবতা নিয়ে বিরোধীরা ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সমালোচনায় সরব হয়েছে। বিশেষ করে কংগ্রেস এই ইস্যুতে ভারতের বিদেশ নীতির তীব্র সমালোচনা করছে। হাত শিবিরের বক্তব্য, মোদী সরকার ভারতের চিরায়ত বিদেশ নীতি থেকে সরে যাচ্ছে। চলতি সংঘাত শুরুর মুখেই এই ব্যাপারে মুখ খুলে ছিলেন কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধী। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেইনিকে হত্যার তাৎক্ষণিক নিন্দা না করায় মোদী সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন সনিয়া।