মোল্লাতন্ত্রের পতন (Mullahs must go) কিংবা জাভিদ শাহ অর্থাৎ শাহ জিন্দাবাদ (Javid Shah)— এই স্লোগানগুলো এখন আর ইরানের (Iran) রাস্তায় শোনা যাচ্ছে না।
.jpeg.webp)
গত বছর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়া খামেনেই-বিরোধী আন্দোলন ছিল ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের (1979 Iranian Revolution) পর সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী।
শেষ আপডেট: 21 January 2026 14:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মোল্লাতন্ত্রের পতন (Mullahs must go) কিংবা জাভিদ শাহ অর্থাৎ শাহ জিন্দাবাদ (Javid Shah)— এই স্লোগানগুলো এখন আর ইরানের (Iran) রাস্তায় শোনা যাচ্ছে না। তার বদলে সামনে আসছে আরও ভয়াবহ এক ছবি। আয়াতুল্লা আলি খামেনেইর (Ayatollah Ali Khamenei) নেতৃত্বাধীন শিয়া শাসনের অন্ধকারে ঘটে চলা নির্যাতনের কাহিনি। ইরানের জেলখানা থেকে পাওয়া টুকরো টুকরো খবর অনুযায়ী, বন্দিদের এই হাড়হিম করা ঠান্ডায় জোর করে নগ্ন (forced nudity) করে রাখা হচ্ছে। আবার অনেককে দেওয়া হচ্ছে অজানা ইঞ্জেকশন (unknown injections)। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এই ঘটনাগুলোর মাত্রা এতটাই ভয়াবহ যে তা কল্পনার বাইরে।
স্টারলিঙ্ক (Starlink) মারফত পাঠানো বিচ্ছিন্ন বার্তা, পাচার হওয়া ভিডিও (smuggled videos) এবং দুর্বল ফোন কলের মাধ্যমে সামনে এসেছে হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র। কালো ব্যাগে মোড়া লাশ, মেঝেতে ও স্ট্রেচারে (gurney) সাজানো দেহ, নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে ঘুরে বেড়ানো পরিবার— এই সব দৃশ্য ইরানের থেকে বেরিয়ে এসেছে, যখন সরকারিভাবে দাবি করা হচ্ছে আন্দোলন স্তিমিত।
গত বছর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়া খামেনেই-বিরোধী আন্দোলন ছিল ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের (1979 Iranian Revolution) পর সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী। প্রথমে ভেঙে পড়া অর্থনীতি (collapsing economy) নিয়ে বিক্ষোভ শুরু হলেও, দ্রুত তা রূপ নেয় ধর্মীয় শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জে। একজন ইরানি সরকারি কর্মকর্তা রয়টার্সকে (Reuters) জানান, অন্তত ৫,০০০ মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৫০০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য (security personnel)।
খামেনেই সরকার এর জবাবে নামায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC) এবং গোটা দেশে ইন্টারনেট বন্ধ (internet blackout) করে দেয়। পাশাপাশি, প্রায় ৫,০০০ ইরাকি আরব ভাড়াটে সেনা (Iraqi Arab militias) এনে আন্দোলন দমন করা হয়। এই সময়েই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) বারবার প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং তেহরানকে (Tehran) হুঁশিয়ারি দেন।
গ্রেফতারের পর ইরানের জেলখানায় (Iran's prisons) আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কী হয়েছে, তা নিয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি এক্সপ্রেস (Daily Express)। এক বন্দির পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, বন্দিদের জোর করে জেলের উঠোনে নগ্ন করে রাখা হতো এবং হোস পাইপ দিয়ে ঠান্ডা জল ছিটানো হতো। সবচেয়ে ভয়ের অভিযোগ, অনেক বন্দিকে অচেনা রাসায়নিক ইঞ্জেকশন (unidentified substances) দেওয়া হয়েছে, যার কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি জেল কর্তৃপক্ষ।
১৬ বছরের এক কিশোরসহ একাধিক আন্দোলনকারীকে যৌন নির্যাতন (sexual assault) করা হয়েছে বলে অভিযোগ। কুর্দিস্তান হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্কের (Kurdistan Human Rights Network বা KHRN) প্রতিনিধি রেবিন রহমানি (Rebin Rahmani) দ্য গার্ডিয়ানকে (The Guardian) বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী লাঠি (baton) দিয়ে যৌনাঙ্গে আঘাত করে এবং শারীরিক নির্যাতন চালায়।
৮ জানুয়ারি ইন্টারনেট বন্ধের পর ধীরে ধীরে সামনে আসছে গণহত্যার চিত্র। সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল (Iran International) জানায়, ফোন কল, স্টারলিঙ্ক বার্তা এবং পাচার হওয়া ভিডিও প্রমাণ করছে— শহর, গ্রাম এমনকী প্রত্যন্ত এলাকায়ও গণহত্যা (mass killings) হয়েছে। পরে চিনা বা রুশ সামরিক জ্যামার (Chinese or Russian military-grade jammers) দিয়ে স্টারলিঙ্কও বন্ধ করা হয়। এরপর নিরাপত্তা বাহিনী বাড়িতে বাড়িতে হানা দিয়ে যোগাযোগ সরঞ্জাম (communication equipment) বাজেয়াপ্ত করে, যাতে হত্যাকাণ্ডের তথ্য বাইরে না যায়।
তবে সরকার ও তাদের অনুগতরা একটি সুরক্ষিত ‘হোয়াইটলিস্ট নেটওয়ার্ক’ (whitelist network) ব্যবহার করে আন্দোলন দমন চালিয়ে যায় প্রায় ৩০০টির বেশি জায়গায়। তেহরান থেকে পাঠানো এক বার্তায় এক বাসিন্দা লেখেন, প্রতিটি মানুষই কোনও না কোনও ঘরের লোকের মৃত্যুর খবর দিচ্ছেন। এটা কোনও অতিকথা নয়। আরেকজন লেখেন, তাজরিশ ও নারমাকে পুরসভার জলের গাড়ি রাস্তার রক্ত ধুয়ে দিয়ে যায়।
কিছু ক্ষেত্রে মৃতদের পরিবারকে বুলেটের দাম (pay for bullets) পর্যন্ত দিতে বলা হয়েছে। আবার কোথাও মৃতদের ‘বাসিজ মিলিশিয়া’ (Basij militia) হিসেবে দেখাতে চাপ দেওয়া হয়েছে, যাতে সরকার দেখাতে পারে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি বেশি। এক প্রত্যক্ষদর্শী বিবিসিকে (BBC) বলেন, প্রতিটি গলিতে দু’-তিনজন করে লাশ পড়েছে।
খামেনেই সরকার আন্দোলনকারীদের ‘মোহারেব’ (mohareb) বলে চিহ্নিত করেছে— যার অর্থ আল্লার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। এই অভিযোগের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড (death penalty)। ২৬ বছরের দোকানদার এরফান সোলতানিকে (Erfan Soltani) এই অভিযোগে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সাময়িক স্থগিত (postponed) করা হয়।