ইরানের তরফে স্পষ্ট জবাব, সম্ভাব্য প্রতিশোধ শুধু দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এই ধরনের আগ্রাসন হলে পুরো অঞ্চলের সেই তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতেই আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হবে, যেখানে আমেরিকা ও তার পশ্চিমি মিত্রদের স্বার্থ জড়িত।”

আরব দুনিয়ার জ্বালানি পরিকাঠামোতেই আগুন লাগিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি
শেষ আপডেট: 13 March 2026 07:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আরব দুনিয়ায় চলতে থাকা যুদ্ধ পরিস্থিতির (Iran US Israel war) মধ্যে আরও বড় সংঘাতের ইঙ্গিত দিল ইরান। ইরানের তেল ও গ্যাস অবকাঠামোয় হামলা হলে পুরো আরব দুনিয়ার জ্বালানি পরিকাঠামোতেই আগুন লাগিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি (Iran oil gas infrastructure warning) দিয়েছে তেহরান। বলাই বাহুল্য, আমেরিকা ও ইজরায়েলকে লক্ষ্য করেই এই কঠোর সতর্কবার্তা।
ইরানের আধাসামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) জানিয়েছে, যুদ্ধের আবহে যদি তাদের দেশের তেল-গ্যাস স্থাপনা বা বন্দরগুলির ওপর সামান্যতম আক্রমণও হয়, তাহলে তার জবাব হবে ভয়াবহ।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় অপারেশনাল কমান্ড খতম আল আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়াটার্স–এর এক মুখপাত্র বলেন, ইরানের শক্তিকেন্দ্র বা বন্দরে সীমিত আক্রমণ হলেও তার প্রতিক্রিয়া “চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়ার মতো বিধ্বংসী” হবে।
তাঁর কথায়, “আমরা আগ্রাসী সরকার এবং তাদের সব মিত্রদের সতর্ক করছি, ইসলামিক রিপাবলিক অফ ইরানের জ্বালানি পরিকাঠামো বা বন্দরগুলির ওপর সামান্যতম আক্রমণও হলে আমরা বিধ্বংসী জবাব দেব।”
পাল্টা হামলা সীমাবদ্ধ থাকবে না ইরানে
ইরানের তরফে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য প্রতিশোধ শুধু দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এই ধরনের আগ্রাসন হলে পুরো অঞ্চলের সেই তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতেই আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হবে, যেখানে আমেরিকা ও তার পশ্চিমি মিত্রদের স্বার্থ জড়িত।”
ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই এই হুঁশিয়ারি সামনে এল। ইতিমধ্যেই এই সংঘাতে একাধিক বড়সড় সামরিক হামলা হয়েছে।
মার্কিন সামরিক কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের ভিতরে পাঁচ হাজার পাঁচশোরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এর মধ্যে ৬০টিরও বেশি জাহাজে আঘাত হানার কথাও বলা হয়েছে।
বৃহত্তর আঞ্চলিক অস্থিরতার আশঙ্কা
ইরানের শীর্ষ নেতারাও পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ দিকে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানি বলেন, ইরানের বিদ্যুৎ পরিকাঠামোয় হামলা হলে সারা আরব দুনিয়াতেই বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। বৃহস্পতিবার সামাজিক মাধ্যম X–এ করা এক পোস্টে তিনি লেখেন, “যদি তারা এমনটা করে, তাহলে আধঘণ্টারও কম সময়ে গোটা অঞ্চল অন্ধকারে ডুবে যাবে। আর সেই অন্ধকারই পালাতে থাকা মার্কিন সেনাদের শিকার করার সুযোগ তৈরি করবে।”
আরও এক ধাপ এগিয়ে লারিজানি বলেন, “যুদ্ধ শুরু করা সহজ। কিন্তু কয়েকটা টুইট করে যুদ্ধ জেতা যায় না। এই গুরুতর ভুলের জন্য আমরা আপনাদের অনুতপ্ত না করা পর্যন্ত থামব না।”
প্রসঙ্গত, লারিজানির এই মন্তব্য আসে একদিন পরেই, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন যে ইরানের সামরিক ক্ষমতা অনেকটাই ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
মেরিল্যান্ডে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “তাদের আর কোনও নৌবাহিনী নেই, বিমানবাহিনী নেই, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও নেই। আমরা কার্যত অবাধেই সেই দেশের ওপর দিয়ে চলাফেরা করছি।”
ঐক্যের ডাক ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার
পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠার মধ্যেই ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখা হবে, যাতে ইরানের প্রতিপক্ষদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়।
‘ইরানের ওপর আর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না’
ইরানের উপ-বিদেশমন্ত্রী মাজিদ তখত রাভানচি জানিয়েছেন, তেহরানের প্রধান লক্ষ্য হল ভবিষ্যতে আর যেন কোনও দেশ ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে না পারে।
তেহরানে AFP–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা চাই ভবিষ্যতে আর কোনও যুদ্ধ যেন ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়।” তিনি দাবি করেন, গত বছরের জুনে শুরু হওয়া সংঘর্ষে ১২ দিনের লড়াইয়ের পর সাময়িক যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। কিন্তু আট-ন’মাসের মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল আবার নতুন করে হামলা শুরু করে।
তাঁর কথায়, “আমরা ভবিষ্যতে আর এই ধরনের আচরণ মেনে নিতে চাই না। আমরা বিভিন্ন সময়ে আমাদের প্রতিবেশীদের জানিয়েছিলাম, যদি আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনে যুক্ত হয়, তাহলে মার্কিন সমস্ত সম্পদ ও ঘাঁটি ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠবে।”
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি এই সংঘাতের সূচনা হয়। সেই দিন ইজরায়েল এবং আমেরিকা যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা চালায়। ওই হামলাতেই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। তারপর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত বিস্তৃত হয়ে পুরো আরব দুনিয়া জুড়ে বড় আকারের সংঘাতে পরিণত হয়েছে।