সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মতো দেশ সোজা আঙুল তুলছে ইজরায়েলের বাড়াবাড়ি আর আমেরিকার ভুল কৌশলের (US Strategic Miscalculations) দিকে। এবং আমেরিকার ভিতরেই প্রশ্ন উঠছে এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য কী, দেশ কী পাচ্ছে বা পেল?

শেষ আপডেট: 12 March 2026 17:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইরানের (Iran war) বিরুদ্ধে মার্কিন হামলা শুরু হওয়ার সময়ে ওয়াশিংটনে ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা ছিল—এই যুদ্ধ হবে দ্রুত, সীমিত এবং কার্যত একতরফা। অন্তত হাবে ভাবে সেটাই বোঝাতে চাইছিল তারা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) মাথায় হয়তো ঘুরছিল ইরাক মডেল। যেখানে স্বৈরচারী শাসক সাদ্দাম হোসেনের প্রাসাদে ঢুকে তাঁকে তুলে নিয়ে গেলেই বোধ হয় খেল খতম হয়ে যাবে। কিন্তু মাত্র ১২ দিনের মধ্যেই সেই হিসাব ও ধারণা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে তেহরান। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত এখন বড় আঞ্চলিক সংকটে পরিণত হয়েছে। সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মতো দেশ সোজা আঙুল তুলছে ইজরায়েলের বাড়াবাড়ি আর আমেরিকার ভুল কৌশলের (US Strategic Miscalculations) দিকে। এবং আমেরিকার ভিতরেই প্রশ্ন উঠছে এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য কী, দেশ কী পাচ্ছে বা পেল?
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের (NYT) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া থেকে শুরু করে বিশ্ব অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভুল হিসাব করেছিল। শুধু নিউ ইয়র্ক টাইমস নয়, আন্তর্জাতিক থিঙ্ক ট্যাঙ্কদের অনেকের মতে, ট্রাম্পের অপরিণামদর্শিতার কারণেই এখন নাকানি চোবানি খাচ্ছে মার্কিন বাহিনী। যার ফল ভুগতে হচ্ছে গোটা বিশ্বকে।
মোটামুটি ভাবে ৫ টি কৌশলগত ভুলকে চিহ্নিত করছে কমবেশি সকলেই। সেগুলি হল— ( US 5 Strategic Miscalculations)
১. আয়াতোল্লা আলি খামেইনিকে (Ayatollah Ali Khamenei) হত্যা খতম করতে পারলেই ইরানের মনোবল তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে বলে ধারণা ছিল ট্রাম্পের। কিন্তু হল উল্টোটাই। খামেইনি গর্তে লুকিয়ে ছিলেন না। বরং বীরের মতই মোকাবিলা করে বৃদ্ধ সুপ্রিম কমান্ডার। তা ইরানের শোনিতে যে উষ্ণ স্রোত বইয়ে দেয়। নেতৃত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি মজবুত ও দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা চালিয়ে যায় ইরান। যা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি ট্রাম্প। কারণ, ওয়াশিংটনের মাথায় হয়তো এখনও সাদ্দামের স্মৃতি ছিল তাজা।
২. ইরানের প্রতিক্রিয়াকে হালকা করে দেখা
এটা ভেবে নেওয়াই সবচেয়ে বড় ভুল যে ইরান দুর্বল। পাল্টা হামলায় বেশিদূর এগোতে পারবে না। মার্কিন যুদ্ধ বিশারদরা মনে করেছিলেন, ইজরায়েলে ও আমেরিকার বড় আঘাতে ইরান ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাবে।
কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলির উপর মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি তাদের আঞ্চলিক বন্ধু গোষ্ঠীগুলোকেও সক্রিয় করেছে। ফলে যুদ্ধের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়েছে।
৩. তেলের বাজারের প্রভাব ভুলভাবে বোঝা
জ্বালানি বাজারে কী ধরনের প্রভাব তা অনুমান করাতেও ভুল ছিল। যুদ্ধ শুরুর আগে অনেকেই মনে করেছিলেন তেলের দাম সাময়িকভাবে বাড়বে, পরে আবার স্থিতিশীল হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তেলের দাম দ্রুত ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার টপকে গেছে। বিশ্ব বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে এবং জ্বালানির দাম বাড়ায় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে আমেরিকা সহ বহু দেশে।
৪. হরমুজ প্রণালীর ঝুঁকি উপেক্ষা
ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত শক্তিকে গুরুত্ব দেয়নি—হরমুজ প্রণালী (Hormuz pronali)। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে হয়।
ইরান যখন ইঙ্গিত দেয় যে তারা জাহাজে হামলা করবে বা শিপিং রুট বন্ধ করে দিতে পারে, তখন পারস্য উপসাগরে অনেক জাহাজ চলাচলই কমে যায়। এতে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের আতঙ্ক ছড়ায়।
৫. যুদ্ধ এখন দীর্ঘমেয়াদি সংকট?
যে যুদ্ধকে দ্রুত শেষ করার প্ল্যান ছিল, তা এখন দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। এমনকি ওয়াশিংটনের ভিতরেই কিছু উপদেষ্টা হোয়াইট হাউসকে এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজার পরামর্শ দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যে কোনও সামরিক পদক্ষেপের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা বিশ্ব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিকেও গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়।