হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তার ঝাপটা এসে পড়ছে ভারতেও। ফলে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে আমেরিকার সামনে দুটি বড় বিপদ। অথচ যে কোনও একটাকে বেছে নিতেই হবে—অর্থনৈতিক বিপর্যয় না নৌবাহিনীর সম্ভাব্য সংঘর্ষ।

শেষ আপডেট: 10 March 2026 15:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইরানকে (Iran War) ঘিরে সংঘাত ক্রমশ তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের সামনে এখন ষাঁড়াশি সংকট—বিশ্ব অর্থনীতিকে রক্ষা করবে, নাকি পারস্য উপসাগরে বড়সড় সামরিক ঝুঁকি নেবে। হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। তার ঝাপটা এসে পড়ছে ভারতেও। ফলে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে আমেরিকার সামনে দুটি বড় বিপদ। অথচ যে কোনও একটাকে বেছে নিতেই হবে—অর্থনৈতিক বিপর্যয় না নৌবাহিনীর সম্ভাব্য সংঘর্ষ।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ইতিমধ্যেই ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রপথে তেল পরিবহণ হয়। এই পথ বন্ধ থাকায় তেল সরবরাহ দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। মার্কিন প্রশাসনের আশঙ্কা, যদি এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার দিকে এগোতে পারে।
তেল উৎপাদন বন্ধের আশঙ্কা
আরও বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে তেল উৎপাদক দেশগুলিতে। কুয়েত, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো দেশগুলিতে স্টোরেজ ট্যাঙ্ক দ্রুত ভরে যাচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই তেল কূপ বন্ধ করে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার তেল কূপ বন্ধ হয়ে গেলে তা আবার চালু করা সহজ নয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করবে।
মার্কিন নৌবাহিনীর বড় ঝুঁকি কেন?
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল ট্যাঙ্কার চলাচল পুনরায় চালু করার জন্য মার্কিন প্রশাসন একটি বড় সামরিক পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনী তেলবাহী জাহাজগুলিকে এসকর্ট করে নিরাপদে প্রণালী পার করাবে। এর জন্য মার্কিন ডেস্ট্রয়ার জাহাজগুলো ট্যাঙ্কারগুলিকে সুরক্ষা দেবে এবং লিটোরাল কমব্যাট শিপ (LCS) সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তবে এই মিশনে মার্কিন নৌবাহিনীকে সরাসরি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে ঢুকতে হবে, যা বড় ঝুঁকির।
ইরানের সম্ভাব্য কৌশল
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন (CNN ) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গোয়েন্দা সূত্রের মতে, ইরান ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালীতে বহুস্তরীয় প্রতিরক্ষা তৈরি করেছে। ইরানের রেভলিউশনারি গার্ড ব্যবহার করতে পারে—সমুদ্র মাইন, বিস্ফোরক বোঝাই আত্মঘাতী নৌকা এবং উপকূলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরান সরাসরি উপসাগরে ঢোকার সময় জাহাজে হামলা নাও করতে পারে। বরং তেলভর্তি অবস্থায় প্রণালী ছেড়ে বেরোনোর সময় আঘাত হানতে পারে। আরও উদ্বেগের বিষয়, প্রথম লক্ষ্য হতে পারে LNG ট্যাঙ্কার। বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলি আঘাত পেলে বিস্ফোরণের মাত্রা হতে পারে বেইরুটের বিস্ফোরণের মতোই ভয়াবহ হতে পারে।
‘ডেথ ভ্যালি’ হয়ে উঠেছে হরমুজ
সিএনএন (cnn.com) জানিয়েছে, মার্কিন প্রশাসনের এক সূত্রের ভাষায়, বর্তমানে হরমুজ প্রণালী কার্যত “ডেথ ভ্যালি” বা মৃত্যু উপত্যকা হয়ে উঠেছে। যদিও মার্কিন বিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিঙ্কন ( USS Abraham Lincoln) প্রস্তুত রয়েছে, তবু সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করা নিয়ে প্রশাসনের ভিতরে তীব্র আলোচনা চলছে।
বাজার সামলাতে অন্য পথের খোঁজ
এদিকে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে মার্কিন প্রশাসন আরও কয়েকটি বিকল্প পথও খুঁজছে। এর মধ্যে রয়েছে—রাশিয়ার কিছু তেল সরবরাহে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, ভেনেজুয়েলার উৎপাদন বাড়ানো এবং জাহাজ মালিকদের উৎসাহ দিতে ২০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্বীমা কর্মসূচি চালু করা। তবে এখনই আমেরিকা তাদের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়নি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও থিঙ্ক ট্যাঙ্কগুলির একাংশের মতে, এই সংকট শুধু আন্তর্জাতিক কূটনীতির বিষয় নয়, ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও। কারণ সামনে রয়েছে মার্কিন অন্তর্বর্তী নির্বাচন। সেই সময়ে পেট্রোলের দাম বেড়ে গেলে তা ভোট রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যতক্ষণ না হরমুজ প্রণালী নিরাপদ হয়, ততক্ষণ এই সংকটের প্রকৃত সমাধান সম্ভব নয়। একজন তেল শিল্প বিশেষজ্ঞের কথায়, “আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রণালী খুলে দেওয়া। কারণ এই ২১ মাইল চওড়া জলপথই এখন কার্যত বিশ্ব অর্থনীতিকে পণবন্দি করে রেখেছে।”