খামেনেই-এর (Ayatollah Ali Khamenei) প্রয়াণের খবর চাউর হতেই উত্তাল হয়ে ওঠে শ্রীনগরের (Srreenagar) রাস্তা। মিছিলে মিছিলে একটাই স্লোগান— ‘আল্লাহু আকবর, খামেনেই রেহবর’ (ঈশ্বর মহান, খামেনেই আমাদের নেতা)।

শিয়া মানসে কেন ‘অজেয়’ খামেনেই
শেষ আপডেট: 3 March 2026 14:41
দ্য ওয়াল ব্যুরো: রবিবার আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-এর (Ayatollah Ali Khamenei) প্রয়াণের খবর চাউর হতেই উত্তাল হয়ে ওঠে শ্রীনগরের (Srreenagar) রাস্তা। মিছিলে মিছিলে একটাই স্লোগান— ‘আল্লাহু আকবর, খামেনেই রেহবর’ (ঈশ্বর মহান, খামেনেই আমাদের নেতা)। সেই চেনা দৃশ্য, ছান্দিক বুক চাপড়ে মাতম আর কান্নার রোল। শোকাতুর জনতার চোখেমুখে ক্রোধ আর বিষণ্ণতার মিশেল দেখে মনে হচ্ছিল, শ্রীনগরের রাজপথে যেন অকাল মহরম নেমে এসেছে। কারবালার সেই ঐতিহাসিক শোকগাথা যেন আরও একবার জীবন্ত হয়ে উঠল তপ্ত তেহরানে (Tehran)।
শিয়াদের কাছে খামেনেই: কেবল নেতা নন, ‘আধ্যাত্মিক অভিভাবক’
শিয়া মুসলিমদের (Shia Muslim) কাছে আয়াতোল্লা আলি হোসেনি খামেনেই নিছক কোনও রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না। তাঁর নামের সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল ‘হোসেনি সৈয়দ’ বংশমর্যাদা, যার শিকড় পৌঁছয় খোদ হজরত মহম্মদের পরিবার পর্যন্ত। শিয়া পণ্ডিতদের মতে, খামেনেই ছিলেন একাধারে ‘মারজা আল-তকলিদ’ (অনুকরণের উৎস) এবং ‘ওয়ালি আল-ফকিহ’ (অভিভাবক আইনবিদ)। তাঁদের বিশ্বাস অনুযায়ী, খামেনেই ছিলেন দ্বাদশ ইমাম তথা ‘ইমাম মাহদি’র প্রতিনিধি, যিনি কিয়ামতের আগে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আবির্ভূত হবেন। ফলে তাঁর মৃত্যু শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে কেবল এক নেতার প্রস্থান নয়, বরং তাঁদের বিশ্বাসের ওপর এক চরম আঘাত।
কারবালার ছায়া ও গাজার লড়াই
শ্রীনগরের মিছিলে সামিল এক প্রতিবাদী রাশিদ বলছিলেন, “ইমাম খামেনেই তাঁর পূর্বপুরুষদের দেখানো পথেই হেঁটেছেন। গাজার মজলুম ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি ন্যায়ের সওয়াল করেছিলেন। তাঁকে সপরিবারে শহিদ করা হয়েছে।” শোকাতুরদের দাবি, ইমাম হোসেনকে যেভাবে কারবালার যুদ্ধে ঘিরে ধরে হত্যা করা হয়েছিল, তেহরানে খামেনেই-এর মৃত্যুতে ঠিক সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটল। রমজান মাসে প্রার্থনারত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু তাঁকে শিয়া স্মৃতিতে ‘মজলুম’ বা নিপীড়িত শহিদের মর্যাদা দিয়েছে।
কাশ্মীরি আবেগ ও প্রতিরোধের রাজনীতি
শ্রীনগরের সাংসদ আগা রুহুল্লা মেহদির মতে, খামেনেই ছিলেন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রতিরোধের এক মূর্ত প্রতীক। তিনি বলেন, “তিনি চাইলে অন্য আরব দেশগুলির মতো আমেরিকা বা ইজরায়েলের সঙ্গে আপস করে শান্তিতে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেই পথ বেছে নেননি। গাজার মানুষের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। শোষিত মানুষের কাছে তিনিই ছিলেন শেষ আশার আলো।” উল্লেখ্য, ১৯৮০ সালে খামেনেই একবার কাশ্মীর সফরে এসেছিলেন এবং জামিয়া মসজিদে সুন্নিদের সঙ্গে নামাজ পড়ে শিয়া-সুন্নি ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। সেই স্মৃতি আজও উপত্যকাবাসীর মনে অমলিন।
দৈনন্দিন জীবনে খামেনেই-এর প্রভাব
শিয়াদের ব্যক্তিগত জীবনেও খামেনেই-এর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। পারিবারিক আইন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য বা ধর্মীয় আচার— সব ক্ষেত্রেই তাঁর নির্দেশ বা ফতোয়া ছিল চূড়ান্ত। এমনকি তাঁর অনুগামীরা তাঁদের বার্ষিক আয়ের ২০ শতাংশ ‘খুমস’ (ধর্মীয় কর) হিসেবে তাঁর বা তাঁর প্রতিনিধির হাতে তুলে দিতেন। বিশ্বজুড়ে শিয়াদের জন্য কোনও একজন নির্দিষ্ট পোপ-সদৃশ নেতা না থাকলেও, অধিকাংশ শিয়া হয় ইরাকের আয়াতোল্লা আলি সিস্তানি অথবা ইরানের খামেনেই-এর অনুসারী।
আর ঠিক এই কারণেই শিয়া মানসে খামেনেই-এর প্রয়াণ কেবল একটি রাজনৈতিক মৃত্যু নয়, বরং তাঁদের হাজার বছরের ট্র্যাজেডি ও প্রতিরোধের ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়। শোকাতুর এক মহিলার কথায়, “তিনি আমার বাবা-মায়ের চেয়েও প্রিয় ছিলেন। ঘাতকরা খামেনেই-কে মারতে পেরেছে, কিন্তু তাঁর আদর্শকে মারতে পারবে না।” শ্রীনগরের রাজপথে আছড়ে পড়া সেই মাতম আসলে এক দৃঢ় অঙ্গীকার— ইমাম হোসেনের সেই আদর্শকে আগলে রাখার, যা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে শেখায়নি।