কেন্দ্রীয় সরকারকে ইতিহাসের পাঠ দিয়ে সনিয়া গান্ধী ১৯৯৪ সালের একটি বিশেষ ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, সেই সময় যখন ওআইসি (OIC) রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশনে কাশ্মীর নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনতে মরিয়া ছিল, তখন ইরানই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে সেই চেষ্টা আটকে দিয়েছিল।

খামেনেই-হত্যায় কেন্দ্রের ‘মৌনতা’ আসলে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীনতা’
শেষ আপডেট: 3 March 2026 14:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইরানের (Iran Israel War) সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-এর মৃত্যুতে নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) সরকারের ‘রহস্যময় নীরবতা’ নিয়ে মুখ খুললেন কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেত্রী সনিয়া গান্ধী (Sonia Gandhi)। তাঁর মতে, এই মুহূর্তে দিল্লির নিশ্চুপ থাকা কোনওভাবেই ‘নিরপেক্ষতা’ নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের ‘দায়িত্ব এড়ানো’ বা ‘পলায়নমনোবৃত্তি’রই নামান্তর। একটি ইংরেজি দৈনিকে লেখা কলমে সনিয়া মনে করিয়ে দিয়েছেন, দিল্লির সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক কেবল কৌশলগত নয়, বরং তা প্রাচীন সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য টান।
কেন্দ্রীয় সরকারকে ইতিহাসের পাঠ দিয়ে সনিয়া গান্ধী ১৯৯৪ সালের একটি বিশেষ ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, সেই সময় যখন ওআইসি (OIC) রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশনে কাশ্মীর নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনতে মরিয়া ছিল, তখন ইরানই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে সেই চেষ্টা আটকে দিয়েছিল। সনিয়ার কথায়, “ভারতের অর্থনীতির সেই সংকটজনক সময়ে কাশ্মীর ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক স্তরে যেতে বাধা দিয়ে তেহরান বড় বন্ধুত্বের পরিচয় দিয়েছিল।” এর পাশাপাশি পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরের পাল্টা হিসেবে জহেদানে ভারতের কৌশলগত উপস্থিতির ক্ষেত্রেও ইরানের সহযোগিতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।
‘নীতি নয়, সুবিধাবাদ’: দিল্লির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
গত ১ মার্চ ইরানের পক্ষ থেকে খামেনেই-এর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। এর দু’দিন আগে থেকেই আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলা নিয়ে তোলপাড় বিশ্ব। কিন্তু ভারত সরকার এ নিয়ে কোনও কড়া প্রতিক্রিয়া দেয়নি। সনিয়ার অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইজরায়েলি হামলার তীব্রতাকে এড়িয়ে গিয়ে কেবল সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর ইরানের পালটা হামলার নিন্দা করেছেন। সনিয়ার প্রশ্ন, “একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রধানকে এভাবে হত্যা করার পরও যদি ভারত সার্বভৌমত্ব বা আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে সওয়াল না করে, তবে আমাদের বিদেশনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।”
ইজরায়েল সফর ও ‘টাইমিং’ নিয়ে কটাক্ষ
হামলার মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগেই প্রধানমন্ত্রী ইজরায়েল সফর সেরে ফিরে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকারের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়েছেন। গাজা সংঘাত নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড়, তখন ভারতের এই অবস্থানকে বিঁধতে ছাড়েননি কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন। তিনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর ২০০১ সালের ইরান সফরের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বিজেপি সরকারেরই পূর্বসূরী যেখানে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, বর্তমান সরকার তা বেমালুম ভুলে গিয়েছে।
প্রবাসী ভারতীয়দের নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা
সনিয়া মনে করিয়ে দিয়েছেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় এক কোটি ভারতীয় কাজ করেন। অতীতেও কুয়েত যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইয়েমেন বা সিরিয়া সংকট— প্রতিবারই ভারত নিজের নাগরিকদের উদ্ধার করতে পেরেছে কারণ দিল্লির একটি ‘স্বাধীন’ ও ‘নিরপেক্ষ’ ভাবমূর্তি ছিল। সনিয়ার আশঙ্কা, ভারত যদি আজ অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় চুপ থাকে, তবে আগামী দিনে গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলি ভারতের ওপর কেন ভরসা করবে?
কলমের শেষে সোনিয়া গান্ধী সরকারের ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ স্লোগানটিকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর মতে, এটি কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনীতির স্লোগান নয়, এটি ন্যায়বিচার এবং সংলাপের অঙ্গীকার। সনিয়ার সাফ কথা, “যখন আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন ভেঙে পড়ছে, তখন মৌন থাকা আসলে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।”