মধ্যস্থতাকারীদের মতে, অদূর ভবিষ্যতে সমস্যা মেটার সম্ভাবনা খুবই কম। ওয়াশিংটন ও তেহরান - দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়, যা পরস্পরের সঙ্গে মূলত অসামঞ্জস্যপূর্ণ। উপরন্তু, হামলা স্থগিতের জন্য ইরানের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ না থাকার বিষয়টি বর্তমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ভঙ্গুরতা আরও স্পষ্ট করছে।

অচলাবস্থা জারি, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ক্ষীণ
শেষ আপডেট: 27 March 2026 08:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে দাবি (Trump Iran energy strikes claim) করেছিলেন, ইরানের অনুরোধেই তাদের শক্তি পরিকাঠামোয় হামলা ১০ দিনের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে, সেটি সরাসরি খারিজ করে দিল তেহরান (Iran denies Trump's strike pause request statement)। মধ্যস্থতাকারীদের উদ্ধৃত করে এই তথ্য জানিয়েছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
শুক্রবার ইরানের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, হামলা (US Iran conflict escalation) বন্ধ রাখার জন্য তারা কোনও অনুরোধই করেনি।
এর আগের দিন, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার, ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা “খুব ভালভাবে” এগোচ্ছে। সেই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন, ইরানের শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রগুলিতে হামলা আরও ১০ দিনের জন্য স্থগিত রাখা হবে।
নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ ট্রাম্প লেখেন, “ইরান সরকারের অনুরোধ অনুযায়ী শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র ধ্বংসের সময়সীমা ১০ দিনের জন্য স্থগিত রাখছি। এই বিরতি চলবে ৬ এপ্রিল ২০২৬, রাত ৮টা (ইস্টার্ন টাইম) পর্যন্ত। আলোচনা চলছে এবং, ভুয়ো খবরের বিপরীতে, তা খুব ভালভাবেই এগোচ্ছে।”
আলোচনায় অনিশ্চয়তা, শর্তে আপত্তি তেহরানের
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি সংঘাত মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ১৫ দফা পরিকল্পনার এখনও চূড়ান্ত জবাব দেয়নি ইরান। যদিও আলোচনায় বসার বিষয়ে তারা আগ্রহ দেখিয়েছে, কিন্তু বেশ কিছু শর্ত নিয়ে আপত্তিও জানিয়েছে।
ইরানের মতে, প্রস্তাবে “অতিরিক্ত চাপ” তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার প্রাথমিক শর্ত তারা মানতে নারাজ। পাশাপাশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার প্রতিশ্রুতিও দিতে চাইছে না তেহরান।
হুমকি, বিরতি - বারবার অবস্থান বদল ট্রাম্পের
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে ট্রাম্প সতর্ক করেছিলেন, ইরান যদি কোনও চুক্তিতে না পৌঁছয়, তবে চাপ আরও বাড়ানো হবে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ১০ দিনের বিরতির ঘোষণা করেন।
পরে ফক্স নিউজের ‘The Five’ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান তাঁর কাছে সাত দিনের বিরতি চেয়েছিল। “তারা খুব ভদ্রভাবে আমার লোকজনের মাধ্যমে বলেছিল, আরও কিছু সময় কি পাওয়া যাবে?… তাই আমি তাদের ১০ দিনের সময় দিয়েছি,” বলেন তিনি। সঙ্গে হুঁশিয়ারিও দেন, শর্ত না মানলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
এর আগে হরমুজ খুলে না দিলে হামলার হুমকিও দিয়েছিলেন ট্রাম্প। যদিও পরে “গঠনমূলক আলোচনা”-র কথা উল্লেখ করে পাঁচ দিনের বিরতির ঘোষণা করেন, যার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল শুক্রবার।
সংঘাত থামেনি, বাড়ছে হামলা-পাল্টা হামলা
ট্রাম্প আশাবাদী সুরে কথা বললেও বাস্তবে সংঘাত থামেনি। ইরান একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইজরায়েলের উপর। তেল আভিভ ও হাইফা-সহ একাধিক শহর লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
ইজরায়েলের সেনাবাহিনীর দাবি, অন্তত একটি ব্যালিস্টিক মিসাইল তেল আভিভে আঘাত হেনেছে। কিছু ক্ষেপণাস্ত্রে ক্লাস্টার মিউনিশন ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে, যার ফলে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছোট ছোট বিস্ফোরণ হয়ে বাড়িঘর ও গাড়ির ক্ষতি হয়েছে।
উত্তর ইজরায়েলের নাহারিয়া শহরে হিজবোল্লার রকেট হামলায় অন্তত একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে জরুরি পরিষেবা।
এর পাল্টা জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল ইরানের অভ্যন্তরে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণের বান্দার আব্বাস ও শিরাজ শহরের উপকণ্ঠে বিস্ফোরণের খবর মিলেছে। ইসফাহানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ভবনেও হামলার খবর সামনে এসেছে।
অচলাবস্থা জারি, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ক্ষীণ
বর্তমান অচলাবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ১৫ দফা কাঠামো, যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক ভূমিকার উপর নিয়ন্ত্রণের বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে ইরান পাল্টা দাবি তুলেছে যে, ভবিষ্যতে সামরিক হামলা না করার নিশ্চয়তা, ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্তি, যেখানে লেবাননের মতো দেশও থাকতে পারে।
মধ্যস্থতাকারীদের মতে, অদূর ভবিষ্যতে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা খুবই কম। ওয়াশিংটন ও তেহরান - দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়, যা পরস্পরের সঙ্গে মূলত অসামঞ্জস্যপূর্ণ। উপরন্তু, হামলা স্থগিতের জন্য ইরানের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ না থাকার বিষয়টি বর্তমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ভঙ্গুরতা আরও স্পষ্ট করছে।
প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ব্যর্থ আলোচনার পর শুরু হওয়া এই সংঘাত ইতিমধ্যেই হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়েছে এবং গোটা পশ্চিম এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও তার বড় প্রভাব পড়েছে, তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। নজরদারির জন্য ড্রোন-চালিত দ্রুতগামী নৌযান মোতায়েন করা হয়েছে, যা সক্রিয় সংঘাতে প্রথমবার ব্যবহারের নজির বলেই মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, কূটনীতির কথা যতই বলা হোক, বাস্তবে যুদ্ধের আবহ আরও ঘন হচ্ছে - এটাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে বর্তমান পরিস্থিতিতে।