পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (PTI) দেশের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথ অবরুদ্ধ করে আন্দোলন আরও তীব্র করেছে। একই সঙ্গে ইসলামাবাদে (Islamabad) সংসদ ভবনের কাছে অবস্থান কর্মসূচিও শুরু হয়েছে।

হাজার হাজার পিটিআই সমর্থক ও কর্মী আত্তক ব্রিজ (Attock Bridge) দখল করে নেয়, ফলে খাইবার পাখতুনখোয়া (Khyber Pakhtunkhwa) কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দেশের বাকি অংশ থেকে।
শেষ আপডেট: 18 February 2026 14:39
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান (Imran Khan)-কে ঘিরে উদ্বেগের আবহে বুধবার ফের বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠল পাকিস্তান (Pakistan unrest)। তাঁর দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (PTI) দেশের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথ অবরুদ্ধ করে আন্দোলন আরও তীব্র করেছে। একই সঙ্গে ইসলামাবাদে (Islamabad) সংসদ ভবনের কাছে অবস্থান কর্মসূচিও শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইমরানের বোনেরা অভিযোগ করেছেন, জেলে তিনি “অকল্পনীয় নির্যাতনের” শিকার হচ্ছেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পিসিবি প্রধান মহসিন নকভি (Mohsin Naqvi) তাঁদের হুমকি দিচ্ছেন।
সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত এক আইনজীবীর রিপোর্ট প্রকাশের এক সপ্তাহ পর নতুন করে এই বিক্ষোভ শুরু হয়। ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়, ৭৩ বছর বয়সি প্রাক্তন বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের (1992 World Cup captain) ডান চোখে দৃষ্টিশক্তি নেমে এসেছে মাত্র ১৫ শতাংশে (15% vision)। ২০২৩ সাল থেকে আদিয়ালা জেলে (Adiala Jail) বন্দি ইমরানের পরিবার দ্রুত তাঁর সঙ্গে দেখা করার দাবি জানালেও সরকারের তরফে তাতে কোনও সাড়া মেলেনি।
রিপোর্ট প্রকাশের পর থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল। বুধবার তা বিস্ফোরণের রূপ নেয়। হাজার হাজার পিটিআই সমর্থক ও কর্মী আত্তক ব্রিজ (Attock Bridge) দখল করে নেয়, ফলে খাইবার পাখতুনখোয়া (Khyber Pakhtunkhwa) কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দেশের বাকি অংশ থেকে। এর জেরে তীব্র যানজট তৈরি হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকে শত শত গাড়ি। একই সঙ্গে রাজধানীতে পার্লামেন্ট ভবন (Parliament) ও খাইবার পাখতুনখোয়া হাউসের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছে বিরোধী জোট তেহরিক-ই-তাহাফুজ-ই-আইন পাকিস্তান (Tehreek-e-Tahaffuz-e-Ain Pakistan)। বিক্ষোভের মূল দাবি একটাই— ইমরান খানকে দ্রুত শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে (Shifa International Hospital) স্থানান্তর করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
ইমরানের বোনেরা বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। মঙ্গলবার সাংবাদিক সম্মেলনে উজমা খান (Uzma Khan) ও আলিমা খান (Aleema Khan) অভিযোগ করেন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির (Asim Munir) ও মহসিন নকভি মিলে হেফাজতে ইমরানকে হত্যার “ঘাতক ষড়যন্ত্রে” (lethal conspiracy) যুক্ত। উজমা খান বলেন, “মহসিন নকভি আমাদের হুমকি দিচ্ছেন। ওরা রক্তের স্বাদ পেয়েছে। ইমরান খান বা আমাদের কারও কিছু হলে, মনে রাখবেন, আমরা কাউকেই ছেড়ে কথা বলব না— তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও নয়।” এর আগে ইমরানের আরেক বোন নুরিন নিয়াজি (Noreen Niazi) সেনাপ্রধানকে দায়ী করেন তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতির জন্য। তিনি লেখেন, “‘আসিম আইন’ (Asim Law)-এর নির্দেশে ইমরান খান অকল্পনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর সরাসরি ফল হিসেবেই তাঁর ডান চোখে স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে।”
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে সরকারের সিদ্ধান্তে— ইমরানের মেডিক্যাল পরীক্ষার সময় পরিবারের কোনও প্রতিনিধিকে উপস্থিত থাকতে দেওয়া হয়নি। সোমবার সরকার নিযুক্ত মেডিক্যাল বোর্ড জানায়, ইমরানের চোখের দৃষ্টিশক্তিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে (vision improvement)। বোর্ডের দুই চিকিৎসকের মধ্যে একজন ইমরানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক আসিম ইউসুফের (Aasim Yusuf) সঙ্গেও আলোচনা করেন। পিটিআই সাধারণ সম্পাদক সলমান আক্রম রাজা (Salman Akram Raja) বলেন,
“ইমরান নিজেই জানিয়েছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি দেয়ালের ঘড়ি দেখতে পাচ্ছিলেন না। এখন শুধু ঘড়িটাই নয়, কাঁটাগুলিও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। চিকিৎসকদের মতে, এটি অবিশ্বাস্য উন্নতি।”
অন্যদিকে, তেহরিক-ই-জাওয়ানান পাকিস্তানের প্রধান আবদুল্লা হামিদ গুল (Abdullah Hamid Gul) দাবি করেন, একটি ইনজেকশন দেওয়ার পর থেকেই ইমরানের চোখের অবস্থা ভালো হতে শুরু করেছে। তবে ইমরানের পরিবার সরকারের মেডিক্যাল বোর্ডের সব দাবিই সরাসরি খারিজ করেছে।
ইমরানের চোখের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেট তারকা সুনীল গাভাসকর (Sunil Gavaskar) ও কপিল দেব (Kapil Dev)-সহ একাধিক কিংবদন্তি ক্রিকেটার পাকিস্তান সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন— ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ককে অবিলম্বে যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
গত দু’মাসের মধ্যে এটি দ্বিতীয়বার, ইমরানের স্বাস্থ্যের কারণে পাকিস্তানজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল। নভেম্বরেও রাওয়ালপিন্ডিতে (Rawalpindi) টানা দু’দিন নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে পিটিআই কর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছিল। তখন গুজব ছড়িয়েছিল, আদিয়ালা জেলের ভিতরে ইমরান খুন হয়েছেন। পরে তাঁর এক বোনের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি মিললে বিক্ষোভ থামে। ২ ডিসেম্বর উজমা খান জেলে গিয়ে জানান, ইমরান ভালো আছেন, তবে তাঁকে একা একটি সেলে রাখা হয়েছে (solitary confinement)। এবার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিশক্তিই নতুন করে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। সমর্থকদের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। চোখের বদলে চোখ— এই স্লোগানেই নতুন করে আন্দোলনের আগুন জ্বলতে শুরু করেছে পাকিস্তানে।