ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের পরমাণু অস্ত্রের (nuclear weapons) সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকলেও, সেই প্রবণতায় এবার বড়সড় পরিবর্তন ঘটতে চলেছে।

পারমাণবিক অস্ত্র ভাণ্ডারে ভারতের চেয়ে চিন বহু এগিয়ে
শেষ আপডেট: 17 June 2025 08:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের পরমাণু অস্ত্রের (nuclear weapons) সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকলেও, সেই প্রবণতায় এবার বড়সড় পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। ২০২৫ সালে এসে বিশ্ব যেন ফের ঢুকে পড়েছে নতুন এক পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতার অধ্যায়ে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (SIPRI)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৯ টি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র বর্তমানে আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয়ভাবে তাদের অস্ত্রভাণ্ডারের আধুনিকীকরণ এবং সম্প্রসারণ করছে। এ ব্যাপারে দক্ষিণ এশিয়ায় চিনের (China) বাড়াবাড়ি নয়াদিল্লির উদ্বেগ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
বিশ্বের মোট পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা এখন প্রায় ১২,২৪১। এর মধ্যে ৯৬১৪টি রয়েছে সক্রিয় সামরিক স্টকে তথা মজুতভাণ্ডারে, যা প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। এই মজুদের মধ্যেও প্রায় ৩৯১২টি ওয়ারহেড সরাসরি মিসাইল বা যুদ্ধবিমানে মোতায়েন করা রয়েছে। এর মধ্যেই প্রায় ২১০০টি রয়েছে উচ্চমাত্রার প্রস্তুতির অবস্থায়। এবং এই ২১০০টি ওয়ারহেডের প্রায় সবই রয়েছে আমেরিকা ও রাশিয়ার দখলে।
SIPRI-এর পারমাণবিক তথ্য প্রকল্পের পরিচালক হ্যান্স এম ক্রিস্টেনসেন বলেন, কীভাবে সব অস্ত্রভাণ্ডার বৃদ্ধি পাচ্ছে তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিপদ ক্রমশই বাড়ছে।
বিশ্বের মোট পরমাণু অস্ত্রের প্রায় ৯০ শতাংশই রাশিয়া ও আমেরিকার হাতে। যদিও ২০২৪ সালে তাদের অস্ত্রভাণ্ডারের আকারে তেমন পরিবর্তন হয়নি, তবে দু’দেশই ব্যাপক আধুনিকীকরণ প্রকল্প চালাচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালে নিউ স্টার্ট (New START) চুক্তি শেষ হলে এই আধুনিকীকরণ আরও গতি পাবে বলেই আশঙ্কা।
আমেরিকার পরমাণু আধুনিকীকরণ পরিকল্পনায় বাজেট ও পরিকল্পনা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে, ফলে পুরো প্রকল্পের খরচও বাড়তে পারে। অন্যদিকে, রাশিয়ার ক্ষেত্রেও সারমাত আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষায় ব্যর্থতা এবং অন্যান্য প্রকল্পে দেরি লক্ষ্য করা গেছে। তবে দুই দেশই ভবিষ্যতে আরও বেশি ওয়ারহেড মোতায়েনের লক্ষ্যে এগোচ্ছে।
চিনের দ্রুত উত্থান (China’s nuclear weapons or warheads)
সবচেয়ে দ্রুত গতিতে পারমাণবিক অস্ত্র বাড়াচ্ছে চীন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চিনের কাছে অন্তত ৬০০ ওয়ারহেড রয়েছে বলে SIPRI অনুমান করছে। প্রতিবছর প্রায় ১০০টি করে নতুন ওয়ারহেড যুক্ত করছে বেজিং। উত্তর ও পূর্ব চিনের মরুভূমি ও পাহাড়ি এলাকায় ইতিমধ্যেই ৩৫০টির বেশি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো তৈরি হয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে চিনের কাছে ১৫০০ ওয়ারহেড থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও তখনও রাশিয়া ও আমেরিকার তুলনায় তা অনেকটাই কম থাকবে।
দক্ষিণ এশিয়ার উত্তেজনা
২০২৪ সালে ভারতও তার অস্ত্রভাণ্ডার (India nuclear warheads) সামান্য বাড়িয়েছে এবং নতুন প্রজন্মের ‘ক্যানিস্টারাইজড’ মিসাইল তৈরি করেছে, যেগুলি একাধিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম। পাকিস্তানও নতুন ডেলিভারি সিস্টেম এবং ফিসাইল উপাদান সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে।
উত্তর কোরিয়া ও ইজরায়েলের আধুনিকীকরণ
উত্তর কোরিয়া এখনও তার সামরিক পরমাণু কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তাদের হাতে বর্তমানে প্রায় ৫০টি ওয়ারহেড রয়েছে এবং আরও ৪০টির মতো তৈরির উপাদান রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়া ‘ট্যাকটিক্যাল নিউক্লিয়ার ওয়েপন’-এর শেষ ধাপে পৌঁছে গিয়েছে। এমনকি কিম জং উন ঘোষণা করেছেন, দেশের পারমাণবিক কর্মসূচির ‘সীমাহীন’ সম্প্রসারণ হবে।
ইজরায়েল তার অস্ত্রভাণ্ডার প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও তারা নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পাশাপাশি ডিমোনার পারমাণবিক ঘাঁটির আধুনিকীকরণ করছে।
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির সংকট
SIPRI-র ডিরেক্টর ড্যান স্মিথ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, "রাশিয়া-আমেরিকার মধ্যে পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া প্রায় ভেঙে পড়েছে। নতুন কোনও চুক্তির উদ্যোগ নেই। বরং চিনকেও অন্তর্ভুক্ত করার দাবি আরও জটিলতা তৈরি করছে।"
তিনি আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার যুদ্ধ, মহাকাশ প্রযুক্তি, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি ইত্যাদি পরমাণু নীতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। যেকোনও ভুল বোঝাবুঝি বা দুর্ঘটনার ফলে মুহূর্তের মধ্যেই পারমাণবিক সংঘর্ষ শুরু হতে পারে।
নতুন নতুন দেশও ভাবছে পরমাণু অস্ত্র নিয়ে
পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা মজুতের আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালে বেলারুশে রাশিয়া তাদের পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের দাবি পুনরায় জানিয়েছে। ইউরোপের অনেক দেশও আমেরিকার পারমাণবিক অস্ত্র গ্রহণে সম্মতি জানিয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ইউরোপীয় পারমাণবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির কথা বলেছেন।
ড্যান স্মিথের মতে, "পারমাণবিক অস্ত্র মানেই নিরাপত্তা নয়। বরং এই অস্ত্রই অনিশ্চয়তা, সংঘাত ও ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।