মেক্সিকোর সংগঠিত অপরাধ জগতের ইতিহাসে যেন একটা যুগের অবসান হল। পশ্চিম মেক্সিকোয় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় চালানো সামরিক অভিযানে নিহত হলেন কুখ্যাত ড্রাগ লর্ড নেমেসিও রুবেন ওসেগুয়েরা সারভান্তেস, ওরফে ‘এল মেনচো’ (El Mencho)।

কুখ্যাত ড্রাগ লর্ড নেমেসিও রুবেন ওসেগুয়েরা সারভান্তেস, ওরফে ‘এল মেনচো’ (El Mencho)
শেষ আপডেট: 23 February 2026 15:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মেক্সিকোর সংগঠিত অপরাধ জগতের ইতিহাসে যেন একটা যুগের অবসান হল। পশ্চিম মেক্সিকোয় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় চালানো সামরিক অভিযানে নিহত হলেন কুখ্যাত ড্রাগ লর্ড নেমেসিও রুবেন ওসেগুয়েরা সারভান্তেস, ওরফে ‘এল মেনচো’ (El Mencho)। বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর কার্টেল—জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল (CJNG)–এর এই শীর্ষনেতার মাথার দাম ছিল ১ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার। গুলির লড়াইয়ে আহত অবস্থায় ধরা পড়লেও চিকিৎসার পথে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

এল মেনচোর মৃত্যু শুধু একজন অপরাধীর পতন নয়, বরং আধুনিক মেক্সিকোর ড্রাগ সাম্রাজ্যের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের ইতি হল বলে মনে করা হচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞই এল মেনচোর উত্থানকে তুলনা করছেন কলম্বিয়ার কুখ্যাত ড্রাগ সম্রাট পাবলো এসকোবারের (Pablo Escobar) সঙ্গে। যেমন এসকোবার আশির দশকে গোটা কলম্বিয়াকে কাঁপিয়েছিলেন, তেমনই গত এক দশকে এল মেনচো মেক্সিকোর নিরাপত্তা কাঠামোকে কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছিলেন।
পুলিশ থেকে কার্টেল বস—অপরাধের পথে যাত্রা
১৯৬৬ সালে মিচোয়াকান প্রদেশে জন্ম এল মেনচোর। দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে আশির দশকে অবৈধভাবে আমেরিকায় পাড়ি, ক্যালিফোর্নিয়ায় হেরোইন পাচারে জড়ানো, গ্রেফতার ও পরে মেক্সিকোতে প্রত্যর্পণ—এই ছিল তাঁর শুরুর গল্প। দেশে ফিরে কিছুদিন পুলিশের চাকরিও করেন তিনি। সেই সময়ই প্রশাসনের অন্দরমহলের নেটওয়ার্ক ও দুর্বলতাকে কাছ থেকে চেনেন—যা পরে অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ার কাজে লাগে।
মিলেনিও কার্টেলের হাত ধরে অপরাধ জগতে উত্থান, পরে নিজস্ব বাহিনী গড়ে তুলে ২০০৯–১১ নাগাদ CJNG প্রতিষ্ঠা করেন মেনচো। সেখান থেকেই শুরু হয় মেক্সিকোর সবচেয়ে হিংস্র কার্টেল যুদ্ধ।

আধুনিক ‘নার্কো-সাম্রাজ্য’ ও পাবলো এসকোবারের ছায়া
পাবলো এসকোবার যেমন কোকেন সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, তেমনই এল মেনচো মেথ, কোকেন, হেরোইন ও ফেন্টানিলের আন্তর্জাতিক চোরাচালানকে শিল্পের আকার দেন। আমেরিকায় ভয়াবহ ওপিওয়েড সংকটের নেপথ্যে CJNG–এর বড় ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসকোবারের মতোই এল মেনচো ‘ভয় ও জনকল্যাণ’—এই দুই অস্ত্র ব্যবহার করতেন। একদিকে গণহত্যা, শিরশ্ছেদ, পুলিশের উপর হামলা; অন্যদিকে কোভিড কালে দরিদ্রদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ—কার্টেলের লোগো লাগানো প্যাকেট দিয়ে স্থানীয় সমর্থন কেনার কৌশল।

ডোনাল্ড ট্রাম্প, মেক্সিকো ও ড্রাগ যুদ্ধ
এল মেনচোর উত্থান এমন এক সময়ে, যখন আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্ত জুড়ে ড্রাগ পাচার নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। বিশেষ করে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) আমলে মেক্সিকো থেকে আসা মাদককে আমেরিকার ‘জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। সীমান্তে দেওয়াল, কার্টেলকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ ঘোষণার প্রস্তাব—সব কিছুর কেন্দ্রে ছিল CJNG ও এল মেনচোর মতো নাম।
মার্কিন গোয়েন্দা সহায়তায় এল মেনচো হত্যাকাণ্ড সেই দীর্ঘ ড্রাগ যুদ্ধেরই একটি বড় অধ্যায় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ওয়াশিংটনের বার্তা স্পষ্ট—মেক্সিকোর ড্রাগ কার্টেলগুলির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা পিছু হটবে না।

রকেট লঞ্চার, সামরিক কনভয় ও খোলা যুদ্ধ
CJNG–এর ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় ২০১৫ সালে, যখন এল মেনচোকে ধরতে গিয়ে কার্টেলের হামলায় একটি সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত হয়। ২০২০ সালে মেক্সিকো সিটির পুলিশপ্রধান ওমর গার্সিয়া হারফুচের উপর হত্যাচেষ্টাও ছিল এই কার্টেলের কাজ। ভারী অস্ত্র, বুলেটপ্রুফ গাড়ি, সামরিক পোশাকে সজ্জিত বাহিনী—সব মিলিয়ে CJNG কার্যত একটি ছায়া সেনাবাহিনীতে পরিণত হয়।
মৃত্যুর পর কী?
এল মেনচোর মৃত্যুতে একদিকে প্রশাসনের ‘প্রতীকী জয়’ হয়েছে, অন্যদিকে নতুন অশান্তির আশঙ্কাও দেখা যাচ্ছে। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়াতেই একাধিক প্রদেশে রাস্তা অবরোধ, গাড়ি পোড়ানো ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নেতৃত্ব সংকটে CJNG–এর অন্দরেই ক্ষমতার লড়াই শুরু হতে পারে—যার জেরে হিংসা আরও বাড়তে পারে।
পাবলো এসকোবারের মৃত্যুর পর যেমন কলম্বিয়ায় ড্রাগ কার্টেল শেষ হয়ে যায়নি, তেমনই এল মেনচোর পতনও মেক্সিকোর ড্রাগ সমস্যার শেষ নয়। তবে ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম লেখা থাকবে—একজন পুলিশ থেকে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর ড্রাগ সম্রাট হয়ে ওঠার রক্তাক্ত উদাহরণ হিসেবে।