ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘প্রথমা’র দুর্গোৎসব (Durga Puja California) পাঁচ বছরে পা দিল। বেলুড়মঠের প্রতিরূপ মণ্ডপে ভক্তি, শিল্প ও ঐক্যের অনন্য মিলনমেলা।

ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রথমার পুজো।
শেষ আপডেট: 22 September 2025 12:43

ক্যালিফোর্নিয়ার শরতের নীল আকাশে এখন হাওয়া হিমেল সুর তোলে। সোনালি রোদে পাল্টে যাচ্ছে গাছের পাতার রঙ। ঠিক তখনই, এই দূর প্রবাসে বসেও বাঙালি হৃদয় খুঁজে পায় সেই চেনা আবেগ— বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো।
আর সেই আবেগের সঙ্গেই এ বছর পাঁচ বছরে পা রাখল ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান ফ্রান্সিস্কোর “প্রথমা”র দুর্গোৎসব। “প্রথমা”— নামেই যেন লুকিয়ে আছে উৎসবের প্রথম আলো, নতুন সূচনার সুর।
পাঁচ বছর আগে সিলিকন ভ্যালির কিছু শহরের অভিজ্ঞ বাঙালি, যারা বহু বছর আমেরিকার বিভিন্ন অর্গানাইজেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হল নতুন প্রজন্মের সমমনস্ক, স্বপ্নবাজ বাঙালিরা। ভাবনা একটাই— দূর দেশে থেকেও শরতের এই উৎসবের আনন্দে সবাই মিলে মেতে ওঠা। তাঁদের হাত ধরেই জন্ম নিল “প্রথমা”র পুজো। নামের মতোই, প্রথমার এই পুজোয় সবাই প্রথম। এই পুজো আমাদের সবার পুজো।

আজ পাঁচ বছরে পৌঁছে প্রথমা হয়ে উঠেছে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রবাসী বাঙালিদের এক মিলনমেলা। ঢাকের শব্দ, চণ্ডীপাঠের মন্ত্রোচ্চারণ, ধূপের গন্ধ, আর মেয়েদের হাতে বানানো ভোগের স্বাদে মিলেমিশে এক হয়ে যায় বাঙালির মন।

প্রতি বছরই তাঁরা পুজোর আবহকে নতুন মাত্রায় উপহার দেন প্রবাসীদের কাছে। এ বছরের বিশেষ আকর্ষণ, প্রথমার পুজো মণ্ডপ। ক্যালিফোর্নিয়ার এক টুকরো বাংলায় যেন দাঁড়িয়ে উঠেছে বেলুড়মঠের প্রতিরূপ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই বিশাল আয়োজনের দায়িত্ব নিয়েছেন প্রথমার সদস্যরাই। বড়দের পাশাপাশি ছোট্ট খুদে সদস্যরাও হাত মিলিয়েছে এই অসাধারণ শিল্পকর্মে। নিজেদের হাতে কাঠামো গড়া, রঙে রঙে সাজানো, আর সর্বোপরি তার পরিপূর্ণ রূপায়ন— সব মিলিয়ে যেন শিল্প ও ভক্তির এক অনন্য নিদর্শন।
প্রথমার প্রেসিডেন্ট, আমাদের প্রিয় দীপা মন্ডল— যে বাঙালির উত্তেজনা আর আবেগকে প্রতিনিয়ত ভরপুর রাখার চেষ্টা করে চলেছেন। তাঁর কাছে এবারের পুজো নিয়ে জানতে চাইলে দীপাদি বললেন, “আমাদের প্রথমার পুজো মানে শুধু দেবী দর্শন নয়। এই পুজো মানে মিলেমিশে কাজ করার আনন্দ, একসাথে স্বপ্ন দেখা, একসাথে পূরণ করা, একসাথে নাচের তালে মেতে ওঠা। সেই আনন্দের টানেই প্রবাসে থেকেও বাঙালি নিজের শিকড়কে খুঁজে নেয়। আর সেই টানের নামই ‘প্রথমা’।”

প্রত্যেক বাঙালির কাছে পুজোর গান মানে বাংলার তাবড় শিল্পীদের কালজয়ী সৃষ্টি, যার আবেশ যুগ পেরিয়ে আজও ছুঁয়ে যায় হৃদয়। সেই ধারাতেই ‘প্রথমা’ প্রবাসে তৈরি করেছে নিজস্ব জায়গা— সদস্যদের কণ্ঠে নতুন গান, যা শুনলেই মনে হয় আমরা যেন আমাদের চেনা শহরেই রয়েছি।
এই বছর ২৬, ২৭ ও ২৮ সেপ্টেম্বর, প্রথমার পুজো মণ্ডপে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসবে, দেবী আসীন হবেন সিংহাসনে, আর মহাষ্টমীর অঞ্জলীর মন্ত্রোচ্চারণে ভক্তির অর্ঘ্য নিবেদিত হবে। তখন মনে হবে, ক্যালিফোর্নিয়ার বুকে সত্যিই এক টুকরো বেলুড়মঠ দাঁড়িয়ে আছে।

পাঁচ বছরের এই যাত্রা তাই শুধু একটি পুজোর নয়, বরং এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন, যা ‘প্রথমা’ প্রতিটি বাঙালিকে তার শিকড়ের সঙ্গে বেঁধে রাখে, যত দূরেই সে থাকুক না কেন। প্রবাসে থেকেও প্রথমা মনে করিয়ে দেয়: দুর্গাপুজো আমাদের নস্টালজিয়ার প্রাণকেন্দ্র। আমাদের সন্তানরা, যারা আমেরিকার মাটিতেই বড় হচ্ছে, তারাও বাজাচ্ছে ঢাক, শিখছে রবীন্দ্রসংগীত, শিখছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ। এভাবেই বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকার ছড়িয়ে পড়ছে আগামী প্রজন্মের মনে।

আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা। ক্যালিফোর্নিয়ার আকাশে যখন সূর্য তার সোনালি আলো ছড়াবে, তখন প্রথমার প্যান্ডেল ভরে উঠবে ঢাকের আওয়াজে, ধূপের গন্ধে ভেসে যাবে অমলিন নস্টালজিয়া। যেন দূর দেশে থেকেও শরতের সেই অমোঘ ডাক বলছে, “মা এসেছেন, এসেছেন ঘরে— প্রথমার ঘরে।”