শান্তির বার্তা দিয়ে ক্ষমতায় এলেও ইরানে হামলা চালিয়ে ট্রাম্প খুলে দিলেন যুদ্ধের দরজা। প্রশ্ন উঠছে—এই পদক্ষেপ কি মার্কিন নেতৃত্বকে বিপদের মুখে ফেলবে?

ইরানে হামলা
শেষ আপডেট: 22 June 2025 20:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাড়া ফেলা দেওয়া কবিতাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ‘কেউ কথা রাখেনি’। শনিবাসরীয় সকালে ইরানে মার্কিন হামলা (US attacks Iran) নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণ যেন সে কবিতার কথাই মনে করিয়ে দিল। ট্রাম্পও কথা রাখলেন না।
তাঁর নির্বাচনী প্রচারে ধারবাহিক ভাবে ট্রাম্প বার্তা দিয়েছিলেন, যুদ্ধ নয়, তিনি শান্তির পক্ষে। ইজরায়েল-ইরান (Israel Iran war) সংঘাতে নাক গলিয়ে ট্রাম্প নিজেই খুলে ফেলেছেন এক নতুন যুদ্ধদ্বার। যে যুদ্ধ দরজা এখন মার্কিন নাগরিকদেরও ভয় দেখাচ্ছে। কারণ, সরকারি সংবাদমাধ্যমের মারফত ইরান খোলাখুলি হুঁশিয়ারে দিয়ে জানিয়েছে, আমেরিকা যেন ভয়ানক পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকে। প্রত্যেক মার্কিন নাগরিকই এখন তাদের টার্গেট। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড়, এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ।
যুদ্ধ বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা এখন একমাত্র ইরানের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে। ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও মিত্রদেশগুলিতে আক্রমণ করে, অথবা হিজবুল্লা ও অন্যান্য প্রক্সি গোষ্ঠীকে সক্রিয় করে, তাহলে এই সংঘাত আরও ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে।
শনিবারের অভিযানে ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা (Bunker blaster bomb) ব্যবহার করে ফোর্দোর মতো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক কেন্দ্রে আঘাত হানা হয়েছে। যদিও ট্রাম্প একে ‘‘গ্রেট সাকসেস’’ বলেছেন, কিন্তু নয়াদিল্লির কূটনীতিকদের একাংশের মতে, এই ধরনের হামলা ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরির দিকেই ঠেলে দিতে পারে। কারণ তারা এখন হয়তো এটিকে প্রতিরোধের একমাত্র পথ বলে বিবেচনা করবে।
কূটনীতি ব্যর্থ হলে যুদ্ধ?
সংবাদসংস্থা রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, ট্রাম্প মনে করেছিলেন ইরান আলোচনায় আগ্রহী নয়। তাই হামলাই সঠিক পদক্ষেপ। তবে প্রশ্ন উঠছে—এই ‘সঠিক পদক্ষেপ’ কি শেষমেশ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে আরও দীর্ঘায়িত করবে?
ইরান কী বলছে?
ইরানের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, তারা ‘‘পূর্ণ শক্তিতে প্রতিরোধের অধিকার রাখে’’। ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, তাদের ‘‘জাতীয় শিল্প’’ বন্ধ করা যাবে না। এই অবস্থায় অনেক বিশ্লেষক বলছেন, যদি ইরান বড় আকারে প্রতিশোধ নেয়, তাহলে ট্রাম্পকে হয়তো ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর মতো পদক্ষেপে যেতে হতে পারে—যা তাঁর প্রশাসনের পূর্বঘোষিত নীতির বিরোধিতা করবে। আর সেই পথে গেলে তাকে ঘরোয়া রাজনীতির বিভিন্ন ঘাঁটি—বিশেষ করে রিপাবলিকানদের বিরোধিতার মুখে পড়তে হতে পারে।
মজার ব্যাপার হল, ট্রাম্পেরই স্লোগান ছিল—পিস থ্রু স্ট্রেন্থ, অর্থাৎ শক্তির মাধ্যমে শান্তি। কিন্তু এখন, ইউক্রেন, গাজার মতো সংঘাতের সমাধান না করেই তিনি নতুন করে যুদ্ধের ময়দানে পৌঁছে গেথেন। এই অবস্থান বিশ্ব নেতাদের কাছে ট্রাম্পের ‘শান্তির দূত’ ভাবমূর্তিকে আরও অস্পষ্ট করে তুলছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের রিচার্ড গোয়ান রয়টার্সকে বলেছেন,“ট্রাম্প আবার যুদ্ধের ব্যবসায় ফিরলেন। কেউই হয়তো কখনও বিশ্বাস করেনি যে উনি সত্যিই একজন শান্তিকামী নেতা।” কেবল গায়ান নন, কূটনীতিকদের একটা বড় অংশের মতে, ইরানে হামলা এখন শুধু একটি সামরিক কৌশল নয়, এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব, কূটনৈতিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভবিষ্যতের দিকনির্দেশও করবে। ট্রাম্প যেভাবেই এটিকে ব্যাখ্যা করুন না কেন, বাস্তবতা হল—তিনি এখন একটি যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। সাময়িক জয়ের বাইরে বহু অনিশ্চয়তা ও বিপদের দ্বার উন্মোচন দিয়েছে তাঁর এই পদক্ষেপ।