২০২৫ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপট এই স্বপ্নকে যেন বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নীতি, বিশেষত H-1B ভিসায় বিপুল ফি আরোপ, আমেরিকায় ভারতীয় পেশাজীবীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 20 September 2025 12:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের মধ্যবিত্ত সমাজে কয়েক দশক ধরে একটি অদ্ভুত আকর্ষণ কাজ করছে—“আমেরিকায় যাওয়ার স্বপ্ন”। যাকে বলা হয় দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান ইউএস ড্রিম (The Great Indian American Dream)। পড়াশোনা, গবেষণা, প্রযুক্তিক্ষেত্রে চাকরি কিংবা আইটি ইন্ডাস্ট্রির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে (USA) পাড়ি জমানোর আকাঙ্ক্ষা শুধু ব্যক্তিগত জীবনের উন্নতি নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা ও পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।
কিন্তু ২০২৫ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপট এই স্বপ্নকে যেন বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের (Donald Trump) নতুন নীতি, বিশেষত H-1B ভিসায় (H1B Visa) বিপুল ফি আরোপ, আমেরিকায় ভারতীয় পেশাজীবীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।
ভারতীয় সমাজে ইউএস ড্রিমের শিকড়
ভারত থেকে আমেরিকায় অভিবাসনের ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৭০ ও ৮০ দশকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও গবেষকদের প্রথম বড় ঢেউ যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছয়। ৯০ দশক থেকে ২০০০-এর শুরুতে আইটি বিপ্লবের ফলে হাজার হাজার তরুণ যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে চাকরি নেন।
আর বর্তমান প্রজন্মে অনেকের কাছে সেটাই যেন মোক্ষ হয়ে উঠেছে। উচ্চশিক্ষা শেষে সিলিকন ভ্যালিতে (Silicon Valley) কাজ করা বা মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করা বহু ভারতীয় পরিবারের কাছে গর্বের বিষয়। এভাবেই ইউএস ড্রিম ভারতীয় সমাজে এক প্রতীকী মর্যাদা অর্জন করেছে।
নতুন অভিবাসন নীতি: ১ লক্ষ ডলারের বেড়া
কিন্তু শুক্রবার নতুন অভিবাসন নীতি ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাতে বলা হয়েছে, H-1B ভিসার জন্য আবেদন করতে হলে নিয়োগকর্তাকে দিতে হবে ১ লক্ষ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা।
এই নিয়ম কেবল নতুন আবেদনকারীদের জন্য নয়, যাদের কাছে H-1B ভিসা রয়েছে তারা রিনিউ করতে গেলেও একই টাকা গুনতে হবে। আগে যেখানে প্রক্রিয়াগত খরচ ছিল প্রায় ১৫০০ ডলার, সেখানে এখন খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে নাগালের বাইরে।
এই ফি-র ফলে আমেরিকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কেবল অতি দক্ষ বা উচ্চবেতনের চাকরিজীবীদের জন্য সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি। প্রতিবছর লক্ষাধিক তরুণ যুক্তরাষ্ট্রে মাস্টার্স বা পিএইচডি করতে যান এবং পরে H-1B ভিসায় কাজ শুরু করেন। কিন্তু এখন সেই পথ কার্যত বন্ধ হতে বসেছে। যাঁরা উচ্চশিক্ষা শেষ করে আমেরিকায় থাকতে চাইবেন, তাঁদের নিয়োগকর্তাদের পক্ষে এত বিপুল অর্থ দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এতে প্রতিভাবান তরুণরা অন্য দেশে সুযোগ খুঁজবেন, যেমন কানাডা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া বা সিঙ্গাপুর। এভাবেই কার্যত ধাক্কা খেতে চলেছে তথাকথিত ইউএস ড্রিম তথা আমেরিকায় যাওয়ার স্বপ্ন।
ভারতীয় আইটি শিল্পে ধাক্কা
ইনফোসিস, টিসিএস, উইপ্রো, এইচসিএল, কগনিজান্টের মতো ভারতীয় আইটি কোম্পানিগুলি দীর্ঘদিন ধরে H-1B ভিসার উপর নির্ভরশীল। হাজার হাজার ইঞ্জিনিয়ারকে মার্কিন ক্লায়েন্টের কাছে পাঠিয়ে তারা পরিষেবা দিয়েছে।
এখন—খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনসাইট মডেল ভেঙে পড়তে পারে। কাজ ফেরত আসবে ভারতে বা চলে যাবে কানাডা, মেক্সিকো বা অন্য নিকটবর্তী দেশে। ভারতীয় আইটি পেশাজীবীদের জন্য আমেরিকায় সরাসরি কাজের সুযোগ কমে যাবে বলেই মনে করা হচ্ছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত স্বপ্ন ভাঙবে না, ভারতের বৈদেশিক আয়ের উপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আর্থিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, এই পদক্ষেপে স্থানীয় চাকরির সুযোগ বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে—বিগ টেক কোম্পানি যেমন গুগল, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, মেটা— এরা H-1B-র মাধ্যমে দক্ষ কৌশলী নিয়োগ করে। নতুন খরচের বোঝা তাদের প্রতিভা নিয়োগে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে। স্টার্টআপ ও গবেষণাগার যাদের বাজেট সীমিত, তারা আর আন্তর্জাতিক প্রতিভা আনতে পারবে না। উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতা কমে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকার অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিপুল ফি আদায় আসলে আইনি কাঠামোর বাইরে। কংগ্রেস শুধুমাত্র প্রশাসনিক খরচ তুলতে ফি ধার্য করার অনুমতি দিয়েছে। আদালতে এই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ হলে টিকবে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বিকল্প গন্তব্য: গ্লোবাল ড্রিম
যেখানে আমেরিকা স্বপ্নকে ব্যয়বহুল করছে, সেখানে কানাডা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে। কানাডা ইতিমধ্যেই অভিবাসন-বান্ধব নীতিতে ভারতীয়দের আকর্ষণ করছে। জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস প্রযুক্তি ও গবেষণা খাতে মেধাবীদের স্বাগত জানাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুর তরুণ ভারতীয়দের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। অর্থাৎ, ইউএস ড্রিম এখন রূপ নিচ্ছে “গ্লোবাল ড্রিম”-এ। অর্থাৎ একটা দরজা বন্ধ হলেও ভারতীয় মেধাবী তরুণদের জন্য খুলছে হাজার দরজা।
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, ভারতের মধ্যবিত্ত সমাজে এতদিন আমেরিকায় পাড়ি দেওয়া মানেই ছিল সাফল্য। পরিবার-আত্মীয়রা গর্ব করতেন, প্রবাসী আত্মীয়রা দেশে ফিরে আসলে সামাজিক মর্যাদা আরও বাড়ত। এখন সেই ধারণা বদলাতে শুরু করবে। একদিকে স্বপ্ন ফিকে হবে। অন্যদিকে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে—“শুধু আমেরিকাই নয়, সুযোগ পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে থাকতে পারে।” স্বপ্ন কখনও শেষ হয় না, সে শুধু পথ বদলায়। হয়তো আগামী দিনে ভারতীয় তরুণরা তৈরি করবেন নতুন “গ্লোবাল ড্রিম”—যেখানে সুযোগ থাকবে কানাডা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়ার অন্যান্য দেশেও। আমেরিকার একাধিপত্য ভেঙে যাবে প্রতিভা আকর্ষণের প্রতিযোগিতায়, আর ভারতীয়দের স্বপ্ন আরও বৈচিত্র্যময় হবে।