প্রায় ৩০ বছর পর কন্ডোম সহ যে কোনও গর্ভনিরোধক ব্যবস্থার উপর একধাক্কায় ১৩ শতাংশ মূল্যযুক্ত কর বা বিক্রয় কর বাড়ানো হয়েছে।
.jpeg.webp)
মানুষ সন্তান নিতে উৎসাহিত হবে—এমন আশা অবাস্তব।
শেষ আপডেট: 1 January 2026 15:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইংরেজি নববর্ষের শুরুর দিন থেকেই কন্ডোমের দাম বাড়াল চিন। যা নিয়ে দেশবাসীর চোখ কপালে উঠেছে। একইসঙ্গে বিরক্তি ও হাসিরও খোরাক হচ্ছে কমিউনিস্ট সরকার। প্রায় ৩০ বছর পর কন্ডোম সহ যে কোনও গর্ভনিরোধক ব্যবস্থার উপর একধাক্কায় ১৩ শতাংশ মূল্যযুক্ত কর বা বিক্রয় কর বাড়ানো হয়েছে। একসময়কার জনবিস্ফোরণ রুখতে ১৯৯৩ সালে গর্ভনিরোধক যে কোনও সামগ্রী ও ব্যবস্থাকে করহীন করেছিল সরকার। তারাই ৩০ বছর পর নতুন ব্যবস্থা চালু করায় চিনে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
আজ, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হওয়া এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল, যখন জনসংখ্যা হ্রাস ও জন্মহারের লাগাতার পতনে গভীর সঙ্কটে রয়েছে বেজিং। নতুন করটি চিনের সামগ্রিক ভ্যাট কাঠামোর সংস্কারের অংশ, যার সূচনা হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। সে সময় এক-সন্তান নীতি কার্যকর থাকায় সরকার নিজেই বিনামূল্যে বা ভর্তুকিতে গর্ভনিরোধক সরবরাহ করত। সেই আমলে অনেক ক্ষেত্রে জোর করে গর্ভপাত করানো হয়েছিল, এমনকী সরকার নির্দিষ্ট সংখ্যার বাইরে জন্মানো শিশুদের পরিচয়পত্র না দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
কিন্তু সময় বদলেছে। এখন সেই একই দেশ জন্মহার বাড়াতে বিয়ে ও সন্তান জন্মে উৎসাহ দিতে নানা উৎসাহমূলক কর্মসূচি চালু করেছে। যেমন— সন্তান জন্মে ভর্তুকি, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন দীর্ঘ ছুটি, শিশুর যত্ন, বিবাহ-পরামর্শ পরিষেবা এবং প্রবীণ পরিচর্যায় করছাড় ইত্যাদি। তবু গর্ভনিরোধকের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতুক ও উদ্বেগ— দুটোই দেখা যাচ্ছে। বহু তরুণের বক্তব্য, কন্ডোমের দাম বাড়লেই সন্তান গ্রহণের সিদ্ধান্ত বদলে যাবে— এমন ভাবনা অবাস্তব। কারণ চিনে একটি শিশুকে বড় করার খরচ বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল।
ইউওয়া পপুলেশন রিসার্চ ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, শিক্ষাখরচ, কর্মজীবী মায়েদের উপর চাপ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে চিনে সন্তান প্রতিপালনের খরচ অত্যন্ত বেশি। তার উপর দীর্ঘদিনের মন্দা ও আবাসন খাতের সঙ্কটে তরুণদের সঞ্চয় কমেছে, ভবিষ্যৎ নিয়েও আস্থা টলমল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, গর্ভনিরোধকের দাম বাড়লে ছাত্রছাত্রী ও স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে এগুলি হাতের নাগালের বাইরে যেতে পারে। তার ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৪ সালে পাশ হওয়া নতুন ভ্যাট আইনের অধীনেই এই ১৩ শতাংশ কর বসানো হয়েছে। এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল করব্যবস্থাকে আধুনিক করা এবং আগের প্রশাসনিক নির্দেশনাভিত্তিক নিয়মগুলোকে আইনের আওতায় আনা। ভ্যাট চিনের রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস। মোট কর আদায়ের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে এখান থেকে।
২০১৫ সালে এক-সন্তান নীতি বাতিল এবং ২০২১ সালে তিন সন্তানের অনুমতি দেওয়ার পর থেকে সরকার একাধিক কর্মসূচি চালু করেছে, যাতে জনসংখ্যার হার বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন প্রদেশে আইভিএফ চিকিৎসায় ছাড়, অতিরিক্ত সন্তানের জন্য নগদ সহায়তা, নবদম্পতিদের জন্য দীর্ঘ ছুটি চালু হয়েছে। ২০২৪ সালে সরকার প্রথমবার জাতীয় স্তরে শিশু পরিচর্যা ভর্তুকি প্রকল্পে ৯০ বিলিয়ন ইউয়ান বরাদ্দ করে এবং প্রসবসংক্রান্ত সব খরচ স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানায়।
তবু জন্মহার থামেনি। ২০২৪ সালে চিনে জন্ম নিয়েছে মাত্র ৯.৫৪ মিলিয়ন শিশু— যা এক দশক আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। টানা অন্তত তিন বছর ধরে মৃত্যুর সংখ্যা জন্মের চেয়ে বেশি। ২০২৩ সালে জনসংখ্যার নিরিখে চিনকে ছাপিয়ে যায় ভারত।
নতুন আইনে কন্ডোম, গর্ভনিরোধক বড়ি ও অন্যান্য উপকরণের উপর ১৩ শতাংশ ভ্যাট ধার্য হয়েছে। ১৯৯৩ সাল থেকে এগুলি করমুক্ত ছিল। একই সঙ্গে শিশুর যত্ন, ম্যাচিং ও ডেটিং অ্যাপ এবং প্রবীণ পরিচর্যা পরিষেবাকে ভ্যাটের ছাড় দেওয়া হয়েছে— যা সরকারের ‘সন্তানবান্ধব’ নীতিরই অংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে এই করের প্রভাব খুবই সামান্য। সাধারণত কন্ডোমের দাম ৪০ থেকে ৬০ ইউয়ান, আর এক মাসের জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির দাম ৫০ থেকে ১৩০ ইউয়ানের মধ্যে। এই কর থেকে বছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ইউয়ান রাজস্ব আসতে পারে, যা চিনের মোট বাজেট আয়ের (প্রায় ২২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান) তুলনায় নিতান্তই নগণ্য।
এই সিদ্ধান্তের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো ঠাট্টা-বিদ্রুপ শুরু হয়েছে। কেউ লিখেছেন, “দাম বাড়ার আগে সারা জীবন ব্যবহারের জন্য কন্ডোম কিনে রাখব।” আরেকজনের মন্তব্য, “সন্তান নিতে বাধ্য করতে সরকার যে এত দূর যাবে, ভাবা যায় না!” একজন ব্যবহারকারী লেখেন, “কন্ডোমে দাম আর সন্তান পালনের খরচ—এই দুটির তফাত মানুষ খুব ভালোই বোঝে।” স্কাই নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পাঁচ বছরের সন্তানের মা হু লিংলিং বলেন, তিনি আর সন্তান নেবেন না এবং প্রতিবাদ হিসেবে ‘সংযমই বেছে নেবেন’। তাঁর কথায়, “একসময় জোর করে গর্ভপাত করানো হয়েছে, আর এখন এই সিদ্ধান্ত—পুরোটাই হাস্যকর।”
এই প্রতিক্রিয়াগুলোই দেখাচ্ছে, তরুণ প্রজন্মের বড় অংশ আর সন্তান নিতে আগ্রহী নয়। অর্থনৈতিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক সহায়তার অভাব তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কর মানুষের প্রজনন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তেমন প্রভাব ফেলবে না। ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যাবিদ কিয়ান চাই স্কাই নিউজকে বলেন, এই করের প্রভাব “খুবই সীমিত” এবং সন্তান পালনের বিপুল খরচের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। উইসকনসিন–ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ই ফুশিয়ানও বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণে বাধা দেওয়ার যুক্তিতে কর বসানো “নীতিগতভাবে বোধগম্য” হলেও, এতে মানুষ সন্তান নিতে উৎসাহিত হবে—এমন আশা অবাস্তব।
হেনান প্রদেশের ৩৬ বছরের ড্যানিয়েল লুও বলেন, “এক বাক্স কন্ডোমে হয়তো পাঁচ ইউয়ান বেশি লাগবে। বছরে ধরলেও কয়েকশো ইউয়ান। আসল চাপটা অন্য জায়গায়।” তাঁর মতে, সম্পর্ক, বিয়ে ও সন্তান নিয়ে অনীহা বাড়ার পিছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপই মূল কারণ। সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের অভিমত একটাই— শুধু ভ্যাট বাড়িয়ে চিনের জনসংখ্যা সঙ্কটের সমাধান সম্ভব নয়। শিক্ষা ব্যয়, কর্মক্ষেত্রের চাপ, অনিশ্চিত অর্থনীতি ও সামাজিক সহায়তার ঘাটতির মতো গভীর সমস্যাগুলো কাটিয়ে না উঠলে জন্মহার বাড়ানো কঠিনই থাকবে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, গর্ভনিরোধকের দাম বাড়লে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কন্ডোম কেনার ক্ষমতা কমে যাবে। এতে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ, গর্ভপাত ও যৌনবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। শিয়ানের বাসিন্দা রোজি ঝাও সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে বলেন, আর্থিকভাবে দুর্বল বা পড়ুয়াদের অনেকে তখন “ঝুঁকি নিয়ে চলতে বাধ্য হবেন”। কিয়ান চাইয়ের মতে, এতে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর বাড়তি চাপ পড়বে এবং সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়বে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্বের অধ্যাপক ইউন ঝোউ গার্ডিয়ানকে বলেন, গর্ভনিরোধের সুযোগ কমে গেলে তার নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে মহিলাদের উপর— বিশেষ করে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের ক্ষেত্রে। সব মিলিয়ে, সন্তান বাড়াতে আগ্রহী দেশ আর সন্তান নিতে অনিচ্ছুক তরুণ সমাজ— এই টানাপড়েনের মাঝেই চিনের নতুন ভ্যাট নীতি আরও এক বিতর্কের জন্ম দিল।