ভারত অবশ্য বরাবরই স্পষ্ট করে জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল, আছে এবং থাকবে।

ছবি সংগৃহীত
শেষ আপডেট: 25 December 2025 13:19
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পূর্ব লাদাখে (Ladakh) দীর্ঘদিনের সীমান্ত অচলাবস্থার অবসান হলেও ভারতের সঙ্গে চিনের (India China) টানাপড়েন যে পুরোপুরি মিটে যায়নি, তারই ইঙ্গিত মিলল মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের সাম্প্রতিক রিপোর্টে। পেন্টাগনের ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, অরুণাচল প্রদেশকে (Arunachal Pradesh) তাইওয়ানের মতোই নিজের ‘মূল স্বার্থ’-র আওতায় এনে ফেলেছে বেজিং। ফলে ভবিষ্যতে নয়াদিল্লি-বেজিং সম্পর্কের অন্যতম বড় সংঘর্ষকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে ভারতের এই উত্তর-পূর্বের রাজ্যটি।
মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেওয়া ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০৪৯ সালের মধ্যে ‘জাতীয় পুনরুত্থান’-এর লক্ষ্য পূরণ করতে তাইওয়ান, অরুণাচল প্রদেশ এবং দক্ষিণ চিন সাগরের ভূখণ্ড ও সামুদ্রিক দাবিগুলিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে চিন। সেই লক্ষ্যেই বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করা এবং ‘লড়াই জিতে নেওয়ার ক্ষমতা’ সম্পন্ন এক ‘বিশ্বমানের সেনাবাহিনী’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বেজিংয়ের।
ভারত অবশ্য বরাবরই স্পষ্ট করে জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল, আছে এবং থাকবে।
গত বছর পূর্ব লাদাখে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর সেনা প্রত্যাহার নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছিল ভারত ও চিন। তার পর কিছু মাস পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও সম্প্রতি অরুণাচলকে কেন্দ্র করে ফের উত্তেজনার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
গত মাসে লন্ডন থেকে জাপান যাওয়ার পথে সাংহাই বিমানবন্দরে ১৮ ঘণ্টা আটকানো হয় ভারতীয় নাগরিক প্রেমা থংডককে। চিনা কর্তৃপক্ষ তাঁর পাসপোর্টে জন্মস্থান হিসেবে অরুণাচল প্রদেশ লেখা থাকায় সেটিকে ‘অবৈধ’ বলে দাবি করে। খাবার ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকেও তাঁকে বঞ্চিত করা হয় বলে অভিযোগ। পরে লন্ডনে থাকা এক বন্ধুর মাধ্যমে সাংহাইয়ের ভারতীয় কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি ছাড়া পান।
এ সপ্তাহের শুরুতেই আরও একটি ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়ায়। এক ইউটিউবারকে চিনে আটক করা হয়, কারণ তিনি একটি ভিডিওয় অরুণাচল প্রদেশকে ভারতের অঙ্গ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
চিন অরুণাচল প্রদেশকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা ‘জাংনান’ বলে দাবি করে। ১৯১৪ সালের ম্যাকমোহন রেখাকে তারা মানতে নারাজ। প্রথমে শুধু তাওয়াংয়ের উপর দাবি থাকলেও পরে গোটা অরুণাচলের উপরেই দাবি বাড়িয়েছে বেজিং। চাপ বাড়াতে মাঝেমধ্যেই অরুণাচলের বিভিন্ন জায়গার নতুন চিনা নামও প্রকাশ করে তারা।
প্রাক্তন কূটনীতিক মহেশ সচদেবের মতে, এই বিষয়ে আমেরিকার নজর দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কথায়, “লাদাখ নিয়ে মার্কিন রিপোর্টে আগে বিস্তর আলোচনা থাকলেও অরুণাচল নিয়ে তেমন কিছু বলা হয়নি। এবার বিষয়টি উঠে আসা মানে, চিন কীভাবে অরুণাচলে চাপ তৈরির কৌশল নিচ্ছে, তা ওয়াশিংটন বুঝতে পারছে।”
পেন্টাগনের রিপোর্টে ভারতের জন্য আর এক সতর্কবার্তাও রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এলএসি-তে আপাত শান্তি বজায় রাখা চিনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ। এক দিকে সীমান্তে সাময়িক শান্তি, অন্য দিকে ‘চিরবন্ধু’ পাকিস্তানের মাধ্যমে সামরিক চাপ—এই দ্বিমুখী নীতিতেই এগোচ্ছে বেজিং।
অপারেশন ‘সিঁদুর’-এর সময় পাকিস্তানের হাতে চিনা অস্ত্রের ব্যবহারই তার প্রমাণ বলে রিপোর্টে উল্লেখ। পাশাপাশি বলা হয়েছে, সীমান্তে শান্তি রেখে ভারতকে আমেরিকার আরও ঘনিষ্ঠ হওয়া থেকে আটকানোর চেষ্টাও করছে চিন।
সব মিলিয়ে, লাদাখে আপাত শান্তি থাকলেও অরুণাচলকে ঘিরে ভবিষ্যতে ভারত-চিন সম্পর্ক যে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে, সে ইঙ্গিতই দিচ্ছে এই মার্কিন রিপোর্ট।