একদিকে ভারত (India)-র বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ (T20 World Cup) ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশ্বব্যাঙ্ক প্রধান অজয় বাঙ্গাকে (Ajay Banga) রাষ্ট্রপ্রধানের মতো রাজকীয় সংবর্ধনা— এই দুই বিপরীত অবস্থানই ইসলামাবাদের রাজনৈতিক কৌশলকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
.jpeg.webp)
পাকিস্তানে বাঙ্গার সফর ছিল রীতিমতো রাজকীয়।
শেষ আপডেট: 6 February 2026 18:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যদি দ্বিচারিতা (Hypocrisy) কোনও প্রতিযোগিতামূলক খেলা হতো, তাহলে ট্রফিটা অনায়াসেই পাকিস্তানের (Pakistan) হাতে উঠত— এমনটাই বলছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। একদিকে ভারত (India)-র বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ (T20 World Cup) ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশ্বব্যাঙ্ক প্রধান অজয় বাঙ্গাকে (Ajay Banga) রাষ্ট্রপ্রধানের মতো রাজকীয় সংবর্ধনা— এই দুই বিপরীত অবস্থানই ইসলামাবাদের রাজনৈতিক কৌশলকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
বিশ্বব্যাঙ্ক (World Bank)-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে অজয় বাঙ্গার পাকিস্তান সফরকে সরকারিভাবে ‘ব্যক্তিগত’ বলা হলেও বাস্তবে তা ছিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার কঠিন প্রতিফলন। ঋণনির্ভর পাকিস্তানের অর্থনীতি (Fragile Economy) টিকিয়ে রাখতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (IMF, World Bank) উপর নির্ভরতা ক্রমেই বেড়েছে। ফলে বাঙ্গাকে ঘিরে এই উষ্ণ আতিথেয়তা অনেকের কাছেই ‘ভদ্রতার চেয়ে প্রয়োজনের তাগিদ’ বলেই মনে হয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাঙ্ক ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলচুক্তি (Indus Waters Treaty)-র অন্যতম স্বাক্ষরকারী ও মধ্যস্থতাকারী। গত বছর পহলগামে জঙ্গি হামলার (Pahalgam Terror Attack) পর ভারত এই চুক্তি স্থগিত করলে পাকিস্তানের কৃষি ব্যবস্থা (Agriculture Sector) বড়সড় ধাক্কার মুখে পড়ে। কারণ পাকিস্তানের প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষিকাজই নির্ভর করে সিন্ধু নদের (Indus River System) উপর, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা (Food Security)-র মেরুদণ্ড।
গত ন’মাস ধরে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক ফোরাম ও সালিশি আদালতে (Court of Arbitration) ভারতের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করলেও তাতে তেমন ফল মেলেনি। এই প্রেক্ষাপটে বাঙ্গাকে ঘিরে এত বড় সংবর্ধনা অনেকের চোখে বিশ্বব্যাঙ্ক নেতৃত্বের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখার কৌশল (Diplomatic Signalling) ছাড়া আর কিছু নয়। যদিও খোদ অজয় বাঙ্গা আগেই জানিয়েছেন, সিন্ধু জলবিতর্ক মেটাতে বিশ্বব্যাঙ্কের কোনও সরাসরি ভূমিকা নেই, তারা কেবল চুক্তির ‘সহায়ক’ (Facilitator) মাত্র।
তবু পাকিস্তানে বাঙ্গার সফর ছিল রীতিমতো রাজকীয়। পুনেতে (Pune) জন্ম হলেও পাকিস্তানে তাঁর পারিবারিক শিকড় থাকায় সরকারিভাবে তাঁকে ‘নিজের মানুষ’ হিসেবেই তুলে ধরার চেষ্টা চলে। চার দিনের সফরে তিনি খুশাবে (Khushab) যান, যেখানে দেশভাগের (Partition) আগে তাঁর বাবা-মা থাকতেন। তাঁর বাবা হরভজন সিং বাঙ্গা (Harbhajan Singh Banga) ১৯৪৭ সালে ভারতে এসে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে (Indian Army) অফিসার হিসেবে কাজ করেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, ঘোড়সওয়ার বাহিনী (Horse Escort), কুচকাওয়াজের বাজনা (Marching Band), ব্যানার, ছাত্রছাত্রীদের সারিবদ্ধ অভ্যর্থনা— সব মিলিয়ে যেন কোনও বিশ্বব্যাঙ্ক প্রধান নয়, রাষ্ট্রপতির আগমন। নেপথ্যে বেজেছে বলিউডি গান ‘মেরা পিয়া ঘর আয়া’ (Mera Piya Ghar Aaya)। সঙ্গে ছিলেন পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মহম্মদ ঔরঙ্গজেব (Muhammad Aurangzeb) ও পাঞ্জাবের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী।
সবচেয়ে বিতর্ক তৈরি করে পাকিস্তানি আধিকারিকদের দেওয়া সেই ‘প্রতীকী উপহার’— বাঙ্গার পূর্বপুরুষের বাড়ির কাগজপত্র (Ancestral Property Documents)। যে বাড়ি ছেড়ে তাঁর পরিবারকে দেশভাগের সময় পালাতে হয়েছিল, সেই বাড়ির নথি উপহার দেওয়া অনেকের কাছে কেবল করুণ বিদ্রূপ (Bitter Irony)। সফরের শেষ দিনে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ (Shehbaz Sharif)-এর সঙ্গে বৈঠকে মূল আলোচনা ঘুরেছে আগামী দশ বছরে বিশ্বব্যাঙ্ক থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার (Financial Assistance) পাওয়ার চেষ্টা নিয়ে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের মোট বৈদেশিক ঋণ (External Debt) প্রায় ১৩৫ বিলিয়ন ডলার, যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশই বিশ্বব্যাঙ্কের কাছে বকেয়া।
এই বৈঠকের ঠিক আগেই শাহবাজ শরিফ নিজেই স্বীকার করেন, বিদেশে গিয়ে টাকা চাইতে তাঁকে ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির (Asim Munir)-কে লজ্জা পেতে হয়। তাঁর কথায়, “আমরা মাথা নিচু করে ঋণ চাই, এটা আমাদের আত্মসম্মানের উপর বিরাট আঘাত।” সব মিলিয়ে ক্রিকেটে ভারতের সঙ্গে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া আর অর্থনীতিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশ্বব্যাঙ্ক প্রধানের পায়ে ফুল ছড়ানো— এই ভণ্ডামি এখন পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে।