প্যালেস্তাইনের গাজা খাঁড়ি এলাকায় ইজরায়েলি বাহিনীর লাগাতার বোমাবর্ষণ ও কৃত্রিম মন্বন্তর সৃষ্টিতে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে অনাহারে মরতে বসেছেন শয়ে শয়ে সাংবাদিক ও চিত্র সাংবাদিক এবং তাঁদের পরিবার।

এরকম চলতে থাকলে গাজার সঙ্গে মারা পড়বেন সাংবাদিকরাও।
শেষ আপডেট: 24 July 2025 11:37
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘গাজা মরছে। এখন আমরাও গাজার সঙ্গেই মারা যাব।‘ প্যালেস্তাইনের গাজা খাঁড়ি এলাকায় ইজরায়েলি বাহিনীর লাগাতার বোমাবর্ষণ ও কৃত্রিম মন্বন্তর সৃষ্টিতে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে অনাহারে মরতে বসেছেন শয়ে শয়ে সাংবাদিক ও চিত্র সাংবাদিক এবং তাঁদের পরিবার। আরব দুনিয়ার প্রখ্যাত বহুভাষিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং ফ্রান্সের বিখ্যাত এএফপি তামাম দুনিয়ার কাছে তাঁদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কাতর ডাক দিয়েছে। একইসঙ্গে ইজরায়েলকে যুদ্ধবিরতি পালন ও ত্রাণসাহায্যকারী সংস্থাগুলিকে খাদ্যবণ্টনের সুযোগ করে দিতে বলেছে।
আল জাজিরা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের যে সাংবাদিক ও চিত্র সাংবাদিকরা রণক্ষেত্রে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে, দিনরাত এক করে, বিশ্বের কাছে খবর ও ছবি পৌঁছে দিচ্ছেন, এখন তাঁরাই নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য পেটের খিদে মেটাতে একমুঠো খাবার পাওয়ার লড়াই করছেন। এরকম চলতে থাকলে গাজার সঙ্গে মারা পড়বেন সাংবাদিকরাও।
গোটা বিশ্বের সাংবাদিক মহলের কাছে আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্কের পাঠানো এই আবেদন দেওয়া হয়েছে প্রেস ফ্রিডম নিয়ে লড়াই করা সংগঠনগুলিকে এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলিকেও। সকলকে এই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আর্জিতে বলা হয়েছে, গাজায় কৃত্রিমভাবে অনাহার তৈরি করা হয়েছে। শুধু সাধারণ মানুষই নন, সাংবাদিকরাও এর প্রভাবে খেতে পাচ্ছেন না।
দোহার সদর কার্যালয় থেকে দেওয়া ওই বিবৃতিতে আল জাজিরা বলেছে, গত ২১ মাস ধরে ইজরায়েলি বোমাবর্ষণে এবং পরিকল্পিত অনাহার তৈরি করে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের প্রাণ প্রায় বিপন্ন। গাজার প্রতিটি মানুষ এখন বেঁচে থাকার মূল রসদ একমুঠো খাবারে সন্ধানে হাপিত্যেশ করে মরছে। ত্রাণ শিবিরগুলিতেও বোমাবর্ষণ করছে ইজরায়েল। এই গণহত্যার খবর সংগ্রহকারী সাংবাদিকদেরও একই দুর্দশার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
এর আগে ফরাসি সংবাদ সংস্থা এজেন্সে ফ্রান্স প্রেসে (ফরাসিতে) বা এএফপি একইভাবে ইজরায়েলের কাছে আর্জি জানিয়েছে। সংবাদ সংস্থা বলেছে, গাজা খাঁড়ি থেকে সংস্থার ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও তাঁদের পরিবারকে নিরাপদে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দিতে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১৯৪৪ সালের অগস্টে সংস্থা প্রতিষ্ঠার সময় থেকে আমরা বিভিন্ন যুদ্ধে বহু সাংবাদিক বন্ধুকে হারিয়েছি। আমাদের অনেকেই খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ঘায়েল হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, বন্দি হয়েছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমাদের মনে পড়ে না যে, কোনও সাংবাদিক অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছেন। ফ্রান্সের শরিক দেশ ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কিংবা সেদেশে সেনাবাহিনী এই বিবৃতির কোনও জবাব দেয়নি।
মর্মান্তিক বিবরণ দিয়ে এএফপি আরও বলেছে, আমরা দূর থেকেও বুঝতে পারছি, তাঁদের অবস্থা খুবই করুণ। তাঁরা প্রত্যেকেই অল্প বয়সি তা সত্ত্বেও তাঁরা শক্তি-সামর্থ্য হারিয়ে ফেলছেন। অনেকেরই বাইরে বেরিয়ে বা একটু দূরে গিয়ে খবর সংগ্রহ করার মতো শারীরিক ক্ষমতাই নেই। তাঁদের কান্না ও ক্ষুধার্ত বাঁচার করুণ ফোন রোজ আসছে আমাদের কাছে। গত কয়েকদিন ধরে তাঁদের ফোনের বদলে সংক্ষিপ্ত মেসেজ আসছে। তা দিয়েই খবর দিচ্ছি আমরা। কিন্তু, তাঁদের জীবন এখন একটি সুতোয় ঝুলছে। আর চলতে থাকলে তাঁরা আর বাঁচবেন না। যে কোনও মুহূর্তে তাঁদের কারও মৃত্যুর খবর পৌঁছতে পারে। যে খবর শোনা আমাদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠবে।
এএফপি-র সাংবাদিক সংগঠন সোসাইটি অফ জার্নালিস্টস-র তরফে এই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমরা তাঁদের মরতে দিতে চাই না। সেখানে খাবার নেই, খাবার জলও বন্ধ করে দিয়েছে ইজরায়েল। প্রতিদিন মানুষ বিশেষত শিশু-বৃদ্ধরা অনাহারে মারা যাচ্ছেন। উল্লেখ্য, গত জুন মাসে রাষ্ট্রসঙ্ঘও ইজরায়েলের কড়া নিন্দা করেছিল। গাজাবাসীদের জন্য খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাকে যুদ্ধাপরাধ বলে বর্ণনা করেছিল। কিন্তু তাতেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
রয়টার্সের এক মুখপাত্রও তাদের সাংবাদিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, গাজায় খাবার জোগাড় করা এখন খুবই কঠিন কাজ। সে কারণে রয়টার্সের সাংবাদিকদের অতিরিক্ত অর্থ পাঠানো হচ্ছে। রয়টার্স তাঁদের বলেছে, তাঁরা ফিরে আসতে চাইলে সেই ব্যবস্থা করা হবে।