এটা এমন একটা সময় হল, যখন কিছুদিন আগেই সেদেশের প্রেসিডেন্ট শেখ নাহয়ান তিন ঘণ্টার জন্য নয়াদিল্লিতে এসে থেমেছিলেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে গিয়ে দেখা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

আমিরশাহির এই সিদ্ধান্তে পায়ের উপর পাথর পড়েছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের।
শেষ আপডেট: 26 January 2026 15:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইসলামাবাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (Islamabad International Airport) পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে দাঁড়াল সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (United Arab Emirates)। এই সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়ায় (privatisation) বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে ইসলামাবাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তিত সমীকরণও সামনে আনছে। একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আর্থিক সংকটে জর্জরিত পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে প্রাথমিক কাঠামোগত চুক্তি (framework agreement) হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই আলোচনা ভেঙে পড়ে।
এটা এমন একটা সময় হল, যখন কিছুদিন আগেই সেদেশের প্রেসিডেন্ট শেখ নাহয়ান তিন ঘণ্টার জন্য নয়াদিল্লিতে এসে থেমেছিলেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে গিয়ে দেখা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আর সংক্ষিপ্ত হলেও ধারাল সেই বৈঠকের ধারেই গলার শিরা কেটে গিয়েছে পাকিস্তানের। সরকারিভাবে কোনও কারণের উল্লেখ না করা হলেও আমিরশাহির এই সিদ্ধান্তে পায়ের উপর পাথর পড়েছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের।
২০২৫ সালের অগস্টে নীতিগতভাবে যে চুক্তি হয়েছিল, তা পাকিস্তানের দুর্বল বিমান চলাচল খাতে (aviation sector) বিদেশি বিনিয়োগ আনবে বলে আশা করা হচ্ছিল। কিন্তু পরে আমিরশাহি তাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং আউটসোর্সড অপারেশন সামলানোর জন্য কোনও স্থানীয় অংশীদারও নিয়োগ করেনি। ফলস্বরূপ পুরো প্রকল্পটি কার্যত স্থগিত হয়ে যায়।
যদিও প্রতিবেদনে আলোচনার ব্যর্থতার পিছনে সরাসরি কোনও রাজনৈতিক কারণ উল্লেখ করা হয়নি, তবু সময়টা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন পাকিস্তান, সৌদি আরব (Saudi Arabia) ও আমিরশাহির মধ্যে সম্পর্কের ভারসাম্যে (strategic alignment) স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে দুই উপসাগরীয় শক্তিরই দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। তবে ঐতিহাসিকভাবে ইসলামাবাদ সৌদি আরবের দিকেই বেশি ঝুঁকে থেকেছে। সেই সম্পর্ক আরও মজবুত হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন পাকিস্তান ও সৌদি আরব পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি (mutual defence pact) স্বাক্ষর করে। তুরস্কও এই ব্যবস্থায় যোগ দেওয়ার কথা ভাবছে।
অন্যদিকে, আমিরশাহি সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা (defence cooperation) বাড়িয়েছে, যা পাকিস্তানের জন্য কূটনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়। এই প্রবণতা আমিরশাহির কৌশলগত অগ্রাধিকার বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আরব আমিরশাহি ও পাকিস্তানের মধ্যে বিমান পরিবহণে (aviation ties) সহযোগিতার ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৮০-র দশকে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের (Emirates Airlines) শুরুর সময়ে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল—প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং প্রথম বিমান লিজ দেওয়ার মাধ্যমে। এমিরেটসের প্রথম রুট ছিল দুবাই-করাচি। কিন্তু সেই সময়ের তুলনায় আজ পাকিস্তানের জাতীয় বিমান সংস্থা মারাত্মক সংকটে। বছরের পর বছর অব্যবস্থাপনা (mismanagement), প্রাণঘাতী বিমান দুর্ঘটনা, পাইলট লাইসেন্স কেলেঙ্কারি এবং পুরনো প্রযুক্তির কারণে গোটা ক্ষেত্রটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।
যদিও ইউএই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করার অভিজ্ঞতা রাখে। তাদের GAAC সংস্থা কাবুল, হেরাত ও কান্দাহারে গ্রাউন্ড সার্ভিস পরিচালনা করে। তবুও ইসলামাবাদ বিমানবন্দর সামলাতে গেলে দীর্ঘমেয়াদি ও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হতো। সম্প্রতি পাকিস্তানের জাতীয় বিমান সংস্থাকে ব্যবসায়ী আরিফ হাবিবের (Arif Habib) নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়ামের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি সংস্থা ছাড়ার সরকারের কৌশলের অংশ।
এই বিমানবন্দর চুক্তির পিছনে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবকে সামরিক কর্মকর্তা ও উপদেষ্টা সরবরাহ করে আসছে। এর বদলে রিয়াধ একাধিকবার ইসলামাবাদকে আর্থিক সাহায্য দিয়েছে। ২০১৮ সালে ৬ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ এবং পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বড় অঙ্কের আমানত তার উদাহরণ।
সৌদি আরব ও আমিরশাহি দুই দেশই আর্থিক শক্তিকে রাজনৈতিক প্রভাবের (political influence) হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। যেখানে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা ধীরগতিতে চলছিল, সেখানে ইউএই অন্য জায়গায় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেমন ২০২৪ সালে মিশরের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে উন্নয়ন প্রকল্পে তারা ৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষের পর পাকিস্তান উপসাগরীয় বাজারে তার প্রতিরক্ষা রফতানি (defence exports) বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সৌদি আরব সুদানের জন্য পাকিস্তানি বিমান, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চুক্তিতে সমর্থন দিচ্ছে।
এর বিপরীতে ইউএই ভারতের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে ৩ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি (LNG) চুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং পারমাণবিক শক্তি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমঝোতা হয়েছে। সব মিলিয়ে, ইসলামাবাদ বিমানবন্দর চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার ঘটনা শুধু একটি অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলের বদলে যাওয়া শক্তির রাজনীতিরও (power politics) প্রতিফলন।