টেক্সাসের এক রিপাবলিকান (Republican) নেতা এই মূর্তিকে কেন্দ্র করে ‘তৃতীয় বিশ্বের ভিনগ্রহের প্রাণী’ (Third World aliens) মন্তব্য করায় সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

২০২৪ সালে উন্মোচিত পঞ্চধাতু নির্মিত ‘পঞ্চলোহ অভয় হনুমান’ (Panchaloha Abhaya Hanuman) আমেরিকার অন্যতম উচ্চতম হিন্দু ধর্মীয় মূর্তি।
শেষ আপডেট: 19 February 2026 10:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হনুমানের ৯০ ফুট উচ্চতার এক মহাকায় মূর্তিকে ঘিরে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে। টেক্সাসের এক রিপাবলিকান (Republican) নেতা এই মূর্তিকে কেন্দ্র করে ‘তৃতীয় বিশ্বের ভিনগ্রহের প্রাণী’ (Third World aliens) মন্তব্য করায় সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। টেক্সাসের ডালাস-ফোর্ট ওর্থ (Dallas-Fort Worth) অঞ্চলের ম্যাগা (MAGA) আন্দোলনের কর্মী কার্লোস তুরসিওস (Carlos Turcios) সম্প্রতি টেক্সাসের সুগার ল্যান্ডে (Sugar Land) অবস্থিত শ্রীঅষ্টলক্ষ্মী মন্দিরে (Shri Ashtalakshmi Temple) স্থাপিত ভগবান হনুমানের বিশাল মূর্তির একটি ভিডিও শেয়ার করেন। ‘স্ট্যাচু অফ ইউনিয়ন’ (Statue of Union) নামে পরিচিত এই মূর্তিকে ঘিরে তিনি এক্স (X, পূর্বতন Twitter)-এ লেখেন, “এটি ইসলামাবাদ (Islamabad), পাকিস্তান বা নয়াদিল্লি (New Delhi), ভারতের কোনও শহর নয়। এটি সুগার ল্যান্ড, টেক্সাস। তৃতীয় বিশ্বের ভিনগ্রহের জীবরা ধীরে ধীরে টেক্সাস ও আমেরিকা দখল করছে। যুক্তরাষ্ট্রে তৃতীয় বৃহত্তম মূর্তি এটি কেন? এই দখলদারি (invasion) বন্ধ করুন।”
২০২৪ সালে উন্মোচিত পঞ্চধাতু নির্মিত ‘পঞ্চলোহ অভয় হনুমান’ (Panchaloha Abhaya Hanuman) আমেরিকার অন্যতম উচ্চতম হিন্দু ধর্মীয় মূর্তি। ৯০ ফুট উচ্চতার এই ভাস্কর্যটি সেদেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ মূর্তি বলে দাবি করা হয়। এটি প্রবর্তন ও পরিকল্পনা করেন শ্রীচিন্নাজীয়ার স্বামীজি (Sri Chinnajeeyar Swamiji)। মন্দির কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এই মূর্তি শক্তি, ভক্তি ও নির্ভয়ের প্রতীক; একইসঙ্গে এটি শান্তি ও ঐক্যের এক আধ্যাত্মিক কেন্দ্র (spiritual epicenter) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যে ভগবান হনুমান সাহস, আনুগত্য ও ধর্মরক্ষার প্রতীক। প্রবাসে বসবাসকারী ভারতীয় ও হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এই মূর্তি কেবল শিল্পকর্ম নয়, বরং সাংস্কৃতিক শিকড় ও আধ্যাত্মিক পরিচয়ের এক দৃশ্যমান প্রতিফলন।
কার্লোস তুরসিওসের মন্তব্য প্রকাশের পর সামাজিক মাধ্যমে বহু ব্যবহারকারী তাঁর বক্তব্যকে বিদ্বেষমূলক (xenophobic) ও বিভাজন সৃষ্টিকারী বলে আখ্যা দেন। অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বহুত্ববাদী (pluralistic) সমাজব্যবস্থায় অভিবাসী ও বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
এক ব্যবহারকারী কার্তিক গাদা (Kartik Gada) যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত ভাষার একটি পরিসংখ্যান শেয়ার করে লেখেন, দেশে প্রায় ৪১ মিলিয়ন পরিবার স্প্যানিশ (Spanish) ভাষায় কথা বলে, অথচ শীর্ষ দশ ভাষার তালিকায় কোনও ভারতীয় ভাষা নেই। তাঁর মতে, গৃহভাষা আত্মীকরণ (assimilation)-এর অন্যতম সূচক। ভারতীয়-আমেরিকানদের আত্মীকরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে সমালোচকদের আরও তথ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা উচিত।
অন্য এক ব্যবহারকারী অ্যাডেল নাজারিয়ান (Adelle Nazarian) লেখেন, “টেক্সাসে হিন্দুরা পশ্চিমা সভ্যতার জন্য হুমকি নয়। হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরকরণ (proselytization) প্রত্যাখ্যাত। হিন্দু মন্দির বা মূর্তি নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর কোনও যুক্তি নেই।”
আরেক ব্যবহারকারী নুরি সুন্নাহ (Nuri Sunnah) মন্তব্য করেন, এই মূর্তি প্রায় দেড় বছর ধরে সেখানে রয়েছে এবং মন্দিরে আগত হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনার অধিকার সংবিধানসম্মত। “মূর্তিটি কারও ক্ষতি করছে না। অপছন্দ হলে না দেখলেই পারেন,” তিনি লেখেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এর আগেও টেক্সাসের আরেক রিপাবলিকান (Republican) নেতা আলেকজান্ডার ডানকান (Alexander Duncan) মূর্তি নির্মাণের বিরোধিতা করে এক্স-এ প্রশ্ন তুলেছিলেন, “আমরা কেন টেক্সাসে একটি ‘ভুয়া হিন্দু দেবতার’ মূর্তি থাকতে দিচ্ছি? আমরা তো একটি খ্রিস্টান (Christian) জাতি।”
এই মন্তব্যও ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। সমালোচকরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা (religious freedom) নিশ্চিত করেছে এবং রাষ্ট্র কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের একচ্ছত্র আধিপত্যের পক্ষে নয়।
সুগার ল্যান্ডের এই হনুমান মূর্তিকে ঘিরে বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয়, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং অভিবাসন প্রসঙ্গকে আবারও আলোচনায় এনেছে। একদিকে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (America First) জাতীয়তাবাদী অবস্থান, অন্যদিকে বহুসাংস্কৃতিক (multicultural) বাস্তবতা—এই দুই প্রবাহের টানাপোড়েন যেন নতুন করে প্রকাশ পেল।
প্রবাসে ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের দৃশ্যমান উপস্থিতি একদিকে গর্বের, অন্যদিকে কিছু গোষ্ঠীর চোখে বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট মন্দির কর্তৃপক্ষ ও ভক্তদের বক্তব্য স্পষ্ট—এই মূর্তি বিভাজনের নয়, বরং ঐক্য, শক্তি ও ভক্তির প্রতীক।