আগে যেখানে লম্বা লম্বা ভিডিওতে এমন অভ্যাস দেখা যেত, সেখানে ৩০ সেকেন্ডের ক্লিপও দ্রুত দেখতে চাওয়া উদ্বেগের কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 29 May 2025 01:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা সময় ছিল যখন আমরা দীর্ঘ সময়ের ভিডিও দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম। ইনস্টাগ্রামের (instagram) মতো প্ল্যাটফর্মে রিল (reel) আগে থেকেই মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও ছিল, কিন্তু এখন অনেকেই তা আরও দ্রুত দেখতে চাইছেন। চলতি বছরের মার্চে ইনস্টাগ্রাম এমন একটি ফিচার চালু করেছে, যাতে রিল দ্বিগুণ গতিতে (2x speed) দেখা যায়—স্ক্রিনের এক প্রান্তে লং প্রেস করলেই।
মেটার বক্তব্য, এই ফিচার ব্যবহারকারীদের অনুরোধেই আনা হয়েছে, যাতে রিল দেখা আরও ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য’ হয়।
ইউটিউব (YouTube) তো বটেই, নেটফ্লিক্স (Netflix) বা প্রাইম ভিডিও (Prime Video)-এর মতো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মেও এখন দর্শকরা ‘স্কিপ’ বা ‘স্পিড আপ’ অপশনের সুবিধা পাচ্ছেন। ফলে সিনেমাহলে বসে যে মানুষ আগে একটানা বসে তিন ঘণ্টার ছবিও দেখেছেন এক সময়, তাঁরাই এখন থিয়েটারে গেলে একঘেয়ে দৃশ্য এড়াতে না পারার সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। বাড়িতে সিনেমা বা ভিডিও দেখলে গান, দৃশ্য- যেটা মনে হয় অপ্রয়োজনীয়, স্কিপ করে দেন অনায়াসেই।
এই প্রবণতা নতুন নয়। কিন্তু আগে যেখানে লম্বা লম্বা ভিডিওতে এমন অভ্যাস দেখা যেত, সেখানে ৩০ সেকেন্ডের ক্লিপও দ্রুত দেখতে চাওয়া অবশ্যই উদ্বেগের কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মনোবিদ শিনা সুদ জানান, ‘এই প্রবণতার ফলে আমাদের মস্তিষ্ক ধীরগতির বা গভীর কনটেন্ট গ্রহণ করতে পারছে না। ধীরে বলা কথা, গভীর আলোচনা বা বড় বই- যেখানে বেশি মাথা খাটাতে হচ্ছে, সেই সব কিছুতেই বিরক্তি জন্মাচ্ছে।’
কনসালটেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. বিষ্ণু গাডের মতে, ‘দর্শকর এতটাই অধৈর্য হয়ে পড়ছেন যে ৩০ সেকেন্ডও দীর্ঘ বলে মনে হচ্ছে তাঁদের। এই প্রবণতা আমাদের সহ্যশক্তি আরও কমিয়ে দিচ্ছে।’
মানসিক স্বাস্থ্যে এই প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। শুধু কনটেন্ট উপভোগে নয়, সম্পর্ক, নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা, আবেগের সংযোগ এমনকী সৃজনশীলতার ওপরও পড়তে পারে। দ্বিগুণ গতিতে ভিডিও দেখার অভ্যাস তথ্য মনে রাখায় সমস্যা, অগভীর মনোযোগ এবং হতাশার মতো সমস্যা তৈরি করছে।
রিল বা শর্ট ভিডিও যত বেশি স্পিডে দেখা হয়, তত কম সংযোগ তৈরি হয় কনটেন্টের সঙ্গে- ফলে কম তথ্য ধরে রাখা যায় মাথায়। অতিরিক্ত দ্বিগুণ গতিতে কনটেন্ট দেখার ফলে উত্তেজনা, অস্থিরতা, দ্রুত কথা বলা, সহানুভূতি কমে যাওয়া এবং আবেগজনিত অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
হায়দরাবাদের নিউরোলজিস্ট ডা. বিক্রম শর্মা বলছেন, ‘রিলজাতীয় শর্ট ভিডিও এমনিতেই ইনস্ট্যান্ট গ্র্যাটিফিকেশন তৈরি করে, আর দ্বিগুণ গতি সেই আসক্তিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে গভীর মনোযোগ নষ্ট হয়, এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ধরনই বদলে যায়।’
মনোযোগ ধরে রাখা একটা স্কিল, যা ধীরে ধীরে গড়ে তোলা সম্ভব। নতুন কিছু শেখা, গভীরভাবে কথা শোনা, সম্পর্ক গড়ে তোলা- সবকিছুর জন্যই দরকার নিরবিচ্ছিন্ন মনোযোগ।
মনোবিদরা যা পরামর্শ দিচ্ছেন:
• ফোন ছাড়া খাওয়ার অভ্যাস করুন।
• দিনে কয়েকবার স্ক্রিন থেকে বিরতি নিন।
• DND বা সাইলেন্ট মোড চালু করে বই পড়ুন বা কাজ করুন।
• “Pomodoro” টেকনিক ব্যবহার করুন – ২৫ মিনিট কাজ, ৫ মিনিট বিরতি।
• মনোযোগ বৃদ্ধিতে উপকারী কাজ: পড়া, হাতের লেখা, রান্না, ছবি আঁকা।
• প্রতিদিন পার্কে হাঁটুন বা প্রকৃতির মধ্যে থাকার চেষ্টা করুন, অন্তত ১৫ থেকে ৩০ মিনিট।
• ঘুম, ব্যায়ামের সঙ্গে আপোষ কোনওমতেই চলবে না। ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার রাখুন ডায়েটে।
• মস্তিষ্ককে খাটানোর মতো কাজে নিযুক্ত করুন নিজেকে। যেমন- পাজল সলভ করা, নতুন ভাষা শেখা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, পেইন্টিং ইত্যাদি।