সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল এক ভিডিও দাবি করেছে, মাত্র এক থেকে দুই মাসে থাইরয়েডের সমস্যা পুরোপুরি সেরে যায়। তাও আবার ওষুধ ছাড়া!

গ্রাফিক্স- দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 28 May 2025 15:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: থাইরয়েডের গ্ল্যান্ডের (Thyroid gland) সমস্যা এমন এক শারীরিক অবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে এনার্জি লেভেল, মুডের দফারফা তো বটেই হার্টের স্বাস্থ্য, প্রেগন্যান্সিতেও সমস্যা ডেকে আনে। তাই থাইরয়েড সংক্রান্ত সমস্যা একবার এসে গেলে তাকে নিয়ন্ত্রণে আনা বেশ কঠিন হয়ে ওঠে মাঝে মাঝে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল এক ভিডিও দাবি করেছে, মাত্র এক থেকে দুই মাসে থাইরয়েডের সমস্যা পুরোপুরি সেরে যায়। তাও আবার ওষুধ ছাড়া! শুধু মেনে চলতে হয় সাধারণ কিছু অভ্যাস (good habits)। ভিডিওতে বলা হয়- কোষ্ঠকাঠিন্য সারিয়ে তোলা, ত্রিফলা খাওয়া, ডিআইপি ডায়েট অনুসরণ করা এবং দিনে ১০-১২ বার ভুজঙ্গাসন করলেই থাইরয়েড গ্রন্থি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে।

কোষ্ঠকাঠিন্যই কি (constipation) সব রোগের মূলে?
এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। নিয়মিত পেট সাফ হওয়া অবশ্যই সুস্থ থাকার জন্য জরুরি। তবে শুধুমাত্র কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলেই সব রোগ হয়, এই দাবি মানবদেহের জটিলতা এবং আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ধারণাগুলিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। জিনগত কারণ, সংক্রমণ, অটোইমিউন প্রতিক্রিয়া, পরিবেশগত প্রভাব ও জীবনযাত্রা- এমন বহু বিষয়ের ভূমিকা থাকতে পারে।
ত্রিফলা কি থাইরয়েড সারাতে পারে?
ত্রিফলা আয়ুর্বেদে হজমশক্তি ও অন্ত্রের সুস্বাস্থ্যের জন্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু থাইরয়েডের মতো জটিল হরমোনজনিত রোগে ত্রিফলার কার্যকারিতা নিয়ে কোনও বিশ্বাসযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ডিআইপি ডায়েট (DIP Diet) কি থাইরয়েড সারায়?
ডিআইপি ডায়েট মূলত ফলমূল ও কাঁচা শাকসবজি খাওয়ার উপর জোর দেয়। তবে শুধু কোনও ডায়েট থাইরয়েড সারাতে পারে, এমন কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং চিকিৎসকের বিশেষ পরামর্শ ছাড়া ডায়েটে মারাত্মক কোনও পরিবর্তন আনলে শরীরে ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। পুষ্টিবিদের মতে, থাইরয়েডের রোগীদের ক্ষেত্রে গ্লুটেন, চিনি, ও দুগ্ধজাত খাবার বাদ দেওয়া অনেক সময় কাজে দেয়, বিশেষ করে হাশিমোটোর মতো অটোইমিউন রোগে। তবুও শুধুমাত্র ডায়েটই যথেষ্ট নয়, ওষুধ ছাড়া এই রোগ সামলানো বিপজ্জনক।
ভুজঙ্গাসন (Cobra Pose) কি থাইরয়েডের ওষুধের বিকল্প?
ভুজঙ্গাসন যোগাসনের একটি উপকারী আসন, যা রক্তসঞ্চালন বাড়াতে এবং মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু এর কোনও প্রমাণ নেই যে এটি একা থাইরয়েড সারাতে পারে। সঠিক চিকিৎসার পাশাপাশি যোগা এক পরিপূরক হতে পারে, বিকল্প নয়।
তাহলে কি এই সব অভ্যাস মানলেই ১–২ মাসে থাইরয়েডের ওষুধ বন্ধ করা যাবে?
এক কথায়, না। থাইরয়েডের রোগীরা নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে—যেমন ক্লান্তি, ওজন বৃদ্ধি, এমনকী হৃদরোগের সম্ভাবনা। কোনও লক্ষণ কমেছে মনে হলেও ওষুধ বন্ধ বা কমানোর সিদ্ধান্ত কেবল একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে নেওয়া উচিত।
ডা. বর্ষা কাচরু (এন্ডোক্রিনোলজিস্ট, যথার্থ সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল, নয়ডা) বলেন, ‘পুষ্টিকর খাবার, ব্যায়াম, স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ ও পর্যাপ্ত ঘুম- এগুলো থাইরয়েডের নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। কিন্তু হাইপোথাইরয়েডিজম বা হাশিমোটোর মতো নির্দিষ্ট রোগের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র এই উপায়ে মাত্র কয়েক মাসে হরমোনের স্বাভাবিক মাত্রায় ফেরা সম্ভব নয়। চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।’
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত এই দাবি যা বলে, থাইরয়েড মাত্র ১ থেকে ২ মাসের কিছু সাধারণ অভ্যাসে সেরে যায়- তা মূলত ভুল এবং বিভ্রান্তিকর। স্বাস্থ্যকর অভ্যাস রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে, তবে চিকিৎসার বিকল্প নয়। কোনও রোগ নিরাময়ের দাবিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা তথ্যের থেকে বেশি চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর জোর দিন।