স্ট্রেস (Stress) বাড়লেই কেন আমরা খাবারের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয় (comfort food) খুঁজি? বিশেষ করে আনহেলদি ফ্যাটি, মিষ্টি বা নোনতা মুখরোচক খাবার।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 22 May 2025 19:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রচণ্ড চাপ যাচ্ছে, ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলতে থাকা ডেডলাইন বা বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে তুমুল একটা ঝগড়ার পর মনে হয় একটা চকোলেট পেস্ট্রি বা চিজ-বার্স্ট একটা পিজ্জাই হতে পারে সব সমস্যার সমাধান, একমাত্র সান্ত্বনা। এমনটা অনেকেরই হয়। কিন্তু কেন? শুধু আবেগ? নাকি এর পেছনে আছে শরীর ও মস্তিষ্কের জৈবিক প্রতিক্রিয়া?
স্ট্রেস (Stress) বাড়লেই কেন আমরা খাবারের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয় (comfort food) খুঁজি? বিশেষ করে আনহেলদি ফ্যাটি, মিষ্টি বা নোনতা মুখরোচক খাবার।

স্ট্রেস বাড়লে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় শরীর? কী বলছে মেডিক্যাল সায়েন্স?
স্ট্রেসের পরিস্থিতি তৈরি হলেই শরীর fight or flight মোডে চলে যায়, এটি আমাদের আদিম পূর্বপুরুষদের সময় থেকে আত্মরক্ষার স্বার্থে এক প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া। ব্রেন তখন অ্যাড্রেনালিন (adrenaline) ও কর্টিসল (cortisol) হরমোন নিঃসরণের সিগন্যাল দেয়। অ্যাড্রেনালিন দেয় তাত্ক্ষণিক শক্তি। এর প্রভাব খুব বেশি সময় থাকে না কিন্তু কর্টিসল শরীরে থেকে যায় অনেক বেশি সময়ের জন্য। তার প্রভাবেই বাড়ে খিদে। ঝোঁক আসে বিশেষ করে বেশি চিনি, ফ্যাট ও নুনযুক্ত খাবারের প্রতি। শরীর তখন এমন কিছু চায় যা দ্রুত শক্তি দেবে, আর ব্রেন খোঁজে এমন কিছু যা একটু হলেও শান্তির প্রলেপ আনবে মনে।

কেন মিষ্টি বা ফ্যাটি খাবার বেশি টানে?
কমফোর্ট ফুড মানেই চকোলেট, চিপস, পাস্তা, মিষ্টিজাতীয় খাবার- যেগুলো মাত্রাতিরিক্ত ক্যালোরি ও ফ্যাটে ভরপুর। এইসব খাবার ডোপামিন (Dopamin) নামে এক ‘ফিল গুড’ (feel good) কেমিক্যাল নিঃসরণ করে মস্তিষ্কে। ফলে মেজাজ ভাল থাকে, মানসিক প্রশান্তি আনে- সেটা যদি সাময়িক সময়ের জন্যও হয়।
প্রাণীদের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, সুগার ও ফ্যাট জাতীয় খাবার আসলে স্ট্রেস-সম্পর্কিত মস্তিষ্কের অংশকে শান্ত করে। তাছাড়া, এই খাবারগুলো অনেক সময় শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে মনে, যেমন- মায়ের রান্না, অসুস্থতার সময়ে খাওয়া গরম স্যুপ, জন্মদিনের কেক। স্ট্রেস হলে তাই মস্তিষ্ক শুধু স্বাদ নয়, চায় নস্টালজিয়া।

মস্তিষ্কের রাসায়নিক বিক্রিয়া ও আবেগের বশে খাওয়ার সম্পর্ক কী?
হাইপোথ্যালামাস (Hypothalamus) নিয়ন্ত্রণ করে খিদে ও হরমোন নিঃসরণ। অ্যামেগডালা (Amygdala) যুক্ত আবেগ ও আবেগময় স্মৃতির সঙ্গে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ব্রেনের রিওয়ার্ড সিস্টেম (Reward system) বিশেষ করে nucleus accumbens, যেটা স্ট্রেসের সময় খুব সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
যখন আপনি আইসক্রিম খান, তখন মস্তিষ্ক একে ‘রিওয়ার্ড’ হিসেবে দেখে। পরের বার স্ট্রেসের সময়ও সে আপনাকে আবার সেই পথেই টানে।
দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস শুধু খিদেই বাড়ায় না, মেপে খাওয়ার সিদ্ধান্তকেও দুর্বল করে দেয়। ব্রেন স্ক্যান গবেষণায় দেখা গেছে, স্ট্রেস কমিয়ে দেয় prefrontal cortex-এর কার্যকারিতা—যেটা যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত ও নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়ী। ফলে, স্বাস্থ্য সচেতন মানুষও হঠাৎ করে স্যালাড ছেড়ে চিপস তুলে নেয়। এককথায়, স্ট্রেস মস্তিষ্ককে হাইজ্যাক করে। স্ট্রেস কমানোর জন্য কমফোর্ট ফুড কাজ করে সাময়িকভাবে। কারণ তখন ডোপামিন রিলিজ হয়, আপনি মুহূর্তের জন্য ভাল বোধ করেন। কিন্তু এর ফলাফল- আত্মগ্লানি, ওজন বৃদ্ধি, ব্লাড সুগারের ওঠানামা। সেই থেকে আবার নতুন করে স্ট্রেস। লুপের মতো চলতে থাকে।

স্ট্রেস ইটিং (Stress eating) আটকানোর প্রথম ধাপ সচেতনতা। বুঝুন, আপনার কি সত্যিই খিদে পাচ্ছে, নাকি কিছু খেতে পারলে ভাল লাগবে, তাই খেতে ইচ্ছে করছে?
কিছু সহজ ট্রিক মেনে চলতে পারেন-
• হাঁটুন বা হালকা ব্যায়াম করুন। এতে কর্টিসল কমে, ফিল গুড হরমোন বাড়ায়।
• ঘুম ঠিক রাখুন: ঘুমের অভাবে খিদে ও স্ট্রেস বাড়ে
• খাওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন- সত্যিই কি খিদে পেয়েছে, নাকি খাওয়ার ইচ্ছে করছে কেবল?
• ডিপ ব্রিদিং বা ধ্যান করুন। এক মিনিট গভীর শ্বাসও স্ট্রেস কমাতে পারে।
• পুষ্টিকর স্ন্যাকস তৈরি রাখুন
• মাঝে মাঝে ‘চিট মিল’ হলেও নিজেকে দোষ দেবেন না। আপনি মানুষ, রোবট নন।