নিয়মিত হাঁটলে কীভাবে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমে? রক্ত চলাচল, অক্সিজেন ও স্মৃতিশক্তির সঙ্গে হাঁটার গভীর সম্পর্ক জানুন।

ডিমেনশিয়া রুখতে পারে হাঁটা?
শেষ আপডেট: 1 January 2026 18:06
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বয়স বাড়লেই ভুলে যাওয়া— এই ধারণাটা আমাদের সমাজে প্রায় স্বাভাবিক করে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া অনিবার্য নয়। বরং কিছু সহজ দৈনন্দিন অভ্যাস মস্তিষ্ককে দীর্ঘদিন সক্রিয় ও সুস্থ রাখতে পারে। সেই তালিকায় সবচেয়ে সহজ, সবচেয়ে কার্যকর অভ্যাস হল নিয়মিত হাঁটা।
ডিমেনশিয়া এমন একটি স্নায়বিক সমস্যা, যেখানে স্মৃতি, চিন্তাভাবনা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। বিশ্বজুড়ে এই রোগের সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণাগুলি স্পষ্ট করে দিচ্ছে—জীবনযাত্রার কিছু পরিবর্তন এই ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে।
ডিমেনশিয়া কোনও একক রোগ নয়। এটি একাধিক উপসর্গের সমষ্টি, যার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হল আলঝাইমার্স। এতে আক্রান্ত হলে ব্যক্তি শুধু স্মৃতি হারান না, ধীরে ধীরে ভাষা, বিচারবোধ, দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতাও নষ্ট হতে থাকে।
সবচেয়ে কঠিন বিষয় হল, ডিমেনশিয়া ধীরে আসে। প্রথম দিকে ছোটখাটো ভুল, কথা ভুলে যাওয়া, পরিচিত মুখ চিনতে দেরি হওয়া— এই লক্ষণগুলো অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগ গভীর হয়, আর তখন চিকিৎসা শুধু গতি কমাতে পারে, পুরোপুরি সারাতে পারে না।
নিয়মিত হাঁটা যে হার্টের জন্য ভাল, সেটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু হাঁটার প্রভাব মস্তিষ্কে গিয়ে কতটা গভীরভাবে কাজ করে, তা অনেকেই জানেন না।
হাঁটলে শরীরে রক্ত চলাচল বাড়ে। তার সরাসরি প্রভাব পড়ে মস্তিষ্কে। বেশি রক্ত মানে বেশি অক্সিজেন, বেশি পুষ্টি। এর ফলে ব্রেন সেলগুলি আরও সক্রিয় থাকে, নতুন নিউরাল কানেকশন তৈরি হয় এবং পুরনো কোষের ক্ষয় ধীর হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত হাঁটার ফলে হিপোক্যাম্পাস নামে মস্তিষ্কের যে অংশটি স্মৃতির জন্য দায়ী, তার কার্যক্ষমতা দীর্ঘদিন ভালো থাকে।
মস্তিষ্ক শরীরের মাত্র দুই শতাংশ ওজন হলেও, শরীরের মোট অক্সিজেনের প্রায় কুড়ি শতাংশ ব্যবহার করে। হাঁটার সময় শ্বাস-প্রশ্বাস গভীর হয়, ফুসফুস বেশি কার্যকরভাবে কাজ করে। এর ফলে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ে, যা সরাসরি ব্রেন সেলে পৌঁছে যায়।
এই অক্সিজেন ব্রেন সেলের কর্মক্ষমতা বাড়ায়, প্রদাহ কমায় এবং বয়সজনিত ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করে।
নিয়মিত হাঁটার আর একটি বড় উপকার হল মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি ভাল থাকা। হাঁটার সময় শরীরে এমন কিছু হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মানসিক চাপ কমায় এবং মুড ভাল রাখে। কম স্ট্রেস মানেই মস্তিষ্কের ওপর কম চাপ।
যাঁরা নিয়মিত হাঁটেন, তাঁদের ক্ষেত্রে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা এবং নতুন তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে ভাল থাকে—এমনটাই বলছে একাধিক গবেষণা।
ডিপ্রেশন ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। হাঁটা প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ডিপ্রেস্যান্টের মতো কাজ করে। প্রতিদিন কিছুটা সময় হাঁটলে সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মতো ‘ফিল-গুড’ হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মন ভালো রাখে।
মন ভাল থাকলে ঘুম ভাল হয়, সামাজিক যোগাযোগ বাড়ে— এই সবকিছু মিলেই ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন নিয়মিত হাঁটেন, তাঁদের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বিশেষ করে মাঝারি গতিতে হাঁটা, যাতে শ্বাস একটু বাড়ে কিন্তু কথা বলা যায়— সবচেয়ে উপকারী বলে মনে করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা আদর্শ। একটানা না পারলে, দুই বা তিন ভাগে ভাগ করেও হাঁটা যেতে পারে। সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন এই অভ্যাস বজায় রাখা গেলে, দীর্ঘমেয়াদে তার সুফল পাওয়া যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিয়মিততা। ধীরে শুরু করে, নিজের শরীরের ক্ষমতা অনুযায়ী হাঁটার সময় ও গতি বাড়ানোই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
ডিমেনশিয়া ঠেকানোর কোনও ম্যাজিক ওষুধ এখনও নেই। কিন্তু প্রতিদিনের এই ছোট অভ্যাস, হাঁটা, মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হতে পারে। বয়স যতই হোক, হাঁটার জন্য কখনও দেরি হয়ে যায় না। আজ শুরু করলেই, আগামী দিনের মস্তিষ্ক আপনাকে ধন্যবাদ জানাবে।