একশো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ, যখন বার্নআউট, লাইফস্টাইল ডিজিজ আর অ্যাংজাইটি বেড়েই চলেছে, তখন তাঁর দেখিয়ে দেওয়া পথ (vivekananda living well philosophy), স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তাধারা আশ্চর্য রকমভাবে আধুনিক বলেই মনে হয়।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 12 January 2026 20:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রতি বছর জাতীয় যুব দিবস (National youth day) পালন করে এ দেশ, এবং স্মরণ করে এমন এক ব্যক্তিত্বকে, যিনি শুধু একজন সন্ন্যাসী বা দার্শনিক (philosopher) হিসেবে নয়, বরং এমন একজন মানুষ যিনি যুবসমাজের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ে মুখর ছিলেন। কথা হচ্ছে, স্বামী বিবেকানন্দকে (Swami Vivekananda) নিয়ে।
একশো বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ, যখন বার্নআউট (Burnout), লাইফস্টাইল ডিজিজ (lifestyle disease) আর অ্যাংজাইটি (anxiety) বেড়েই চলেছে, তখন তাঁর দেখিয়ে দেওয়া পথ, স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তাধারা (Swami Vivekananda philosophy) আশ্চর্য রকমভাবে আধুনিক বলেই মনে হয়। আজও যেন তা আরও বেশি করে প্রাসঙ্গিক।
উনিশ শতকের শেষ ভাগেই স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও কর্ম - তখন জিম কালচার (modern gym culture), থেরাপি অ্যাপ (therapy app) বা ওয়েলনেস ট্রেন্ডের (wellness trend) কোনও অস্তিত্বই ছিল না। তবু স্বাস্থ্য নিয়ে তাঁর ধারণা সময়ের অনেক আগে থেকেই প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবনদর্শন বলে, সুস্বাস্থ্যের মানে বাহ্যিক সৌন্দর্য, আরাম বা ভোগবিলাস নয় - বরং শক্তি, শৃঙ্খলা এবং জীবনের লড়াইয়ের জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকা।
সব কিছুর আগে শারীরিক বল বা শক্তি
স্বামী বিবেকানন্দের সবচেয়ে সাহসী ও বিতর্কিত ধারণাগুলির একটি ছিল শারীরিক শক্তির উপর তাঁর জোর। তিনি প্রকাশ্যেই দুর্বলতার সমালোচনা করতেন, তবে তা নৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে নয়, বরং একটি স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবে। তাঁর মতে, দুর্বল শরীর মানুষের সাহস, চিন্তার স্বচ্ছতা এবং জীবনের লক্ষ্যকেই সীমিত করে দেয়।
আজকের দিনে, যেখানে ‘ওয়েলনেস’ বলতে অনেকেই হালকাচালের জীবনযাপন বা আরামকেই বোঝেন, সেখানে বিবেকানন্দের বার্তা ছিল একেবারে সোজাসাপ্টা - মনের কাঠিন্যের ভিত কিন্তু শক্তপোক্ত একটি শরীর।
এই শক্তির ধারণা কোনওভাবেই শরীরচর্চা বা প্রদর্শনের বিষয় ছিল না বরং তা ছিল সহনশক্তি, দেহভঙ্গি, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং ক্লান্ত না হয়ে কাজ করার ক্ষমতা নিয়ে। আধুনিক বিজ্ঞানও আজ সেটাই বলছে - নিয়মিত শারীরিক মুভমেন্ট মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়, মনোযোগ বাড়ায় এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

আধুনিক শব্দ ছাড়াই উচ্চারিত মানসিক স্বাস্থ্যের মূল কথা
স্বামী বিবেকানন্দ ‘অ্যাংজাইটি’ বা ‘ডিপ্রেশন’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করেননি। কিন্তু ভয়, আত্মসংশয় এবং মানসিক অস্থিরতা নিয়ে তিনি বারবার কথা বলেছেন। তাঁর চোখে ভয় ছিল ধীরে ধীরে শরীর ও মনকে দুর্বল করে দেওয়া এক ধরনের বিষ, যা স্নায়ুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বিচারবোধ ঝাপসা করে দেয়।
এই ভয় থেকে মুক্তির পথ হিসেবে তিনি পালানোর কথা বলেননি। বরং তাঁর সমাধান ছিল মানসিক প্রশিক্ষণ - আত্মবিশ্বাস, একাগ্রতা এবং আবেগের উপর নিয়ন্ত্রণ।
আজকের যুবসমাজ যখন অনিশ্চয়তা আর চাপের মধ্যে বিপর্যস্ত, তখন বিবেকানন্দের নির্ভীকতার দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, মানসিক দৃঢ়তা কোনও রাতারাতি পাওয়া মোটিভেশন নয় - এটা তৈরি হয় প্রতিদিনের অভ্যাস, চিন্তাভাবনা এবং শৃঙ্খলার মাধ্যমে।

প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা কিন্তু আসলে 'ডিসিপ্লিন'
‘প্রিভেন্টিভ মেডিসিন’ শব্দটি জনপ্রিয় হওয়ার বহু আগেই বিবেকানন্দ সতর্ক করেছিলেন অতিরিক্ত ভোগ, অনিয়মিত ঘুম এবং রুটিনহীন জীবনের বিরুদ্ধে। তাঁর বিশ্বাস ছিল, মানবদেহ তার নিজস্ব এক ছন্দে চলে। ডিসিপ্লিন এখানে কোনও বাধা নয়, বরং শরীরকে সচল রাখার এক ধরনের 'রক্ষণাবেক্ষণ'।
আজকের আধুনিক স্বাস্থ্যপরামর্শও ঠিক সেটাই বলে - নিয়মিত ঘুম, পরিমিত খাদ্যাভ্যাস এবং একটি স্থির দৈনন্দিন রুটিন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমায়। যাকে আজ ‘বায়োহ্যাকিং’ বলে চালানো হচ্ছে, বিবেকানন্দের কাছে তা ছিল নিছক সাধারণ বোধ।

আত্মকেন্দ্রিকতা নয়, সুস্বাস্থ্য এক দায়িত্ববোধ
বিবেকানন্দের মতে, সবচেয়ে অবহেলিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলির একটি ছিল স্বাস্থ্য কোনও ব্যক্তিগত বিলাসিতা নয়, বরং বিশেষ করে তরুণদের জন্য একটি দায়িত্ব। তাঁর মতে, দুর্বল শরীর আর ক্লান্ত মন সমাজসেবা করতে পারে না, সত্যের পথে চলতে পারে না, কিংবা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে না।
নিজের যত্ন নেওয়াকে তিনি কখনও স্বার্থপরতা হিসেবে দেখেননি। বরং তা ছিল নিজেকে প্রস্তুত করে তোলার একটি প্রক্রিয়া।

জাতীয় যুব দিবসে এই বার্তা আরও বেশি গুরুত্ব পায়। এমন এক সংস্কৃতিতে, যেখানে অতিরিক্ত কাজ আর বিশ্রামহীনতাকেই সাফল্যের প্রতীক বানানো হয়েছে, বিবেকানন্দ মনে করিয়ে দেন - বার্নআউট কোনও গর্বের বিষয় নয়।
কেন আজও প্রাসঙ্গিক বিবেকানন্দের স্বাস্থ্যদর্শন
স্বামী বিবেকানন্দের স্বাস্থ্যভাবনা ১২০ বছরের বেশি সময় ধরে টিকে থাকার কারণ একটাই - এটা ট্রেন্ডনির্ভর নয়, এর ভিত চিরকালীন এক সত্য। এতে কোনও সাপ্লিমেন্ট, প্রযুক্তি বা ফ্যাশনের উপর নির্ভরতা নেই।
এই দর্শন দাঁড়িয়ে আছে চারটি চিরন্তন স্তম্ভের উপর - শক্তি, শৃঙ্খলা, নির্ভীকতা এবং দায়িত্ববোধ।