আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য। গবেষকরা বলছেন, আপনার সামাজিক বৃত্তে এমন কিছু মানুষ থাকতে পারেন যারা প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ বা উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়ান। এদের বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন 'হ্যাসলার্স' (Hasslers)। এঁদের উপস্থিতির কারণে আমাদের শরীরের কোষগুলো সাধারণের তুলনায় অনেক দ্রুত বুড়িয়ে যায়।

টক্সিক সঙ্গ বিপজ্জনক
শেষ আপডেট: 10 March 2026 19:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কথায় বলে, ‘সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে সর্বনাশ’। কিন্তু বর্তমান সময়ের নতুন গবেষণা বলছে, শুধু মানসিক বা নৈতিক সর্বনাশ নয়, আপনার চারপাশের বিষাক্ত মানুষেরা (Toxic People) সরাসরি ক্ষতি করছে আপনার শরীরেরও। জীবন থেকে তাঁরা কেড়ে নিচ্ছেন আয়ু, আপনাকে ঠেলে দিচ্ছেন অকাল বার্ধক্যের দিকে।
আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য। গবেষকরা বলছেন, আপনার সামাজিক বৃত্তে এমন কিছু মানুষ থাকতে পারেন যারা প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ বা উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়ান। এদের বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন 'হ্যাসলার্স' (Hasslers)। এঁদের উপস্থিতির কারণে আমাদের শরীরের কোষগুলো সাধারণের তুলনায় অনেক দ্রুত বুড়িয়ে যায়।
কী বলছে এই গবেষণা?
সম্প্রতি 'প্রোসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস' (PNAS) নামক জার্নালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় ২,৬০০ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সামাজিক সম্পর্ক এবং তাঁদের শরীরের বায়োলজিক্যাল স্যাম্পল বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন গবেষকরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে অন্তত ৩ জনের জীবনে এমন একজন 'হ্যাসলার' বা বিরক্তিকর মানুষ রয়েছেন, যিনি প্রতিনিয়ত মানসিক চাপের কারণ। গবেষকরা লালার নমুনা এবং ডিএনএ-র মাধ্যমে ‘এপিজেনেটিক ক্লক’ পরীক্ষা করে দেখেছেন, এই ধরনের বিষাক্ত সম্পর্কের প্রভাবে শরীরের জৈবিক বয়স বা বায়োলজিক্যাল এজিং সাধারণের চেয়ে প্রায় ১.৫ শতাংশ বেশি দ্রুত ঘটে। গড়ে এই ধরনের মানুষরা সমবয়সীদের তুলনায় প্রায় ৯ মাস বেশি বুড়ো হয়ে যান কোষের নিরিখে।
শরীরের ভেতরে ঠিক কী ঘটে?
চেন্নাইয়ের প্রখ্যাত চিকিৎসক ড. ভি মোহন জানিয়েছেন, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরের ভেতর ‘অক্সিডেটিভ স্ট্রেস’ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে আমাদের ক্রোমোজোমের শেষে থাকা প্রতিরক্ষামূলক আবরণ বা ‘টেলোমেয়ার’ (Telomeres) ছোট হতে শুরু করে। টেলোমেয়ার যত দ্রুত ছোট হয়, শরীরের কোষগুলো তত দ্রুত বুড়িয়ে যায়।
শুধু তাই নয়, স্ট্রেস হরমোন হিসেবে পরিচিত কর্টিসল, এপিনেফ্রিন এবং নর-এপিনেফ্রিনের মাত্রা শরীরে সবসময় বেশি থাকে। এর ফলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হওয়া, রক্তনালীর ক্ষতি এবং শরীরের ভেতরে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক কারা?
গবেষণায় একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। দেখা গেছে, স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে তিক্ত সম্পর্কের তুলনায় বাবা-মা বা সন্তানদের সঙ্গে মানসিক চাপের সম্পর্ক শরীরকে দ্রুত বুড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঝগড়া থাকলেও সেখানে সমর্থনের বা ভালোবাসার একটি জায়গা অবশিষ্ট থাকে যা স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। কিন্তু পরিবারের নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে স্থায়ী তিক্ততা শরীরের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সেই লিস্টে থাকতে পারে বন্ধু, অফিস কলিগ বা পাড়াপ্রতিবেশী।
লক্ষণগুলো চিনে নিন
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা ইমোশনাল স্ট্রেইন শুধু মনে নয়, শরীরেও ফুটে ওঠে। চিকিৎসকদের মতে, নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে বুঝবেন আপনার শরীর চাপের সাথে লড়তে পারছে না:
বাঁচার উপায় কী?
এই গবেষণার অন্যতম লেখক বাইউংকিউ লি জানিয়েছেন, জীবন থেকে নেতিবাচকতা এবং বিষাক্ত মানুষকে দূরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। যদিও পরিবার বা কাছের আত্মীয়দের সম্পূর্ণ ত্যাগ করা বাস্তবসম্মত নয়, তবে তাঁদের থেকে একটি নিরাপদ দূরত্ব (Emotional Distance) বজায় রাখা নিজের স্বাস্থ্যের স্বার্থেই প্রয়োজন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লড়াই বা পালানোর (Fight-or-Flight) যে সহজাত প্রক্রিয়া আমাদের মস্তিষ্কে থাকে, বিষাক্ত সম্পর্কের কারণে তা সবসময় সক্রিয় থাকে। ফলে শরীর এক মুহূর্তের জন্য শান্তি পায় না। তাই দীর্ঘায়ু পেতে এবং অকাল বার্ধক্য রুখতে জীবনের চারপাশ থেকে ‘হ্যাসলার’দের চিহ্নিত করে মানসিক শান্তি বজায় রাখাই এখন সুস্থ থাকার সেরা দাওয়াই।