শুনতে দূরত্বের মতো লাগলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটি সম্পর্ক ভাঙার নয়, বরং ঘুমকে প্রাধান্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত। আর পর্যাপ্ত ঘুমই নাকি উল্টে সম্পর্ককে আরও সুস্থ করে তুলতে পারে।

শেষ আপডেট: 20 February 2026 17:52
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সারাদিন নিজেদের জীবনের জাঁতাকলে ব্যস্ত কপোত-কপোতী, সারাদিনের পর রাতটুকুই যা একান্তে একসঙ্গে কাটানোর সময় মেলে। কিন্তু এখানেই ‘স্লিপ ডিভোর্স’ (sleep divorce) ট্রেন্ড নতুন করে ভাবাচ্ছে এই প্রজন্মকে। একই বিছানায় ঘুমোনো যেখানে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার এক নীরব প্রতীক (couples sleep habits) ছিল এতদিন, সেখানে সারাদিনের ব্যস্ততার পর বিছানা আলাদা (Couples Sleep Separately) হলেও সম্পর্কে উষ্ণতা খুঁজে পাচ্ছেন দম্পতিরা। ব্যস্ত জীবনে সম্পর্ক মজবুত (relationship health) করে তোলার জাদুকাঠি কি তবে এই?
ডেডলাইন-সর্বস্ব জীবনে যখন ঘুমই ক্রমশ অধরা হয়ে উঠছে, তখন অনেক দম্পতি একসঙ্গে ঘুমোনোর পুরনো ধারণা নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা শুরু করেছেন। নিজেদের বিশ্রামকে গুরুত্ব দিতে তাঁরা বেছে নিচ্ছেন আলাদা বিছানা, কখনও কখনও আলাদা ঘরও। এই প্রবণতার নামই ‘স্লিপ ডিভোর্স’ (sleep divorce trend)।
শুনতে দূরত্বের মতো লাগলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটি সম্পর্ক ভাঙার নয়, বরং ঘুমকে প্রাধান্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত। আর পর্যাপ্ত ঘুমই নাকি উল্টে সম্পর্ককে আরও সুস্থ করে তুলতে পারে।
স্লিপ ডিভোর্স আসলে কী?
বেঙ্গালুরুর অ্যাপোলো ক্লিনিকের কনসালট্যান্ট সাইকিয়াট্রিস্ট শ্বেতা ছাবড়ার কথায়, অনেক দম্পতি ঝগড়া বা দূরত্বের জন্য নয়, বরং চরম ক্লান্তির কারণেই এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
“স্লিপ ডিভোর্স বলতে বোঝায় এমন এক মধ্যস্থতা যেখানে দম্পতিরা আলাদা বিছানা বা ঘরে ঘুমোচ্ছেন, যাতে ঘুমের মান বজায় থাকে, অথচ আবেগের সংযোগ অটুট থাকে,” বলেন তিনি। অর্থাৎ, ঘুমকে এখন প্রতীক নয়, স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার এক পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে একমত বেঙ্গালুরুর অ্যাস্টার সিএমআই হাসপাতালের স্লিপ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সুনীল কুমার কে। তাঁর মতে, “আলাদা ঘুমোলে গভীর ঘুম হয়, মন ভাল থাকে, অকারণে ঝগড়া কমে - আর ভালবাসা অটুট থাকে।”
ঘুমের ঘাটতির অদৃশ্য ক্ষতি
কম ঘুম মানে শুধু ক্লান্তি নয়, এটি ধীরে ধীরে শরীর ও মনের উপর প্রভাব ফেলে। ডা. ছাবড়ার মতে, কম ঘুমের ফলে মাথাব্যথা, ক্লান্তি চেপে বসে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, মেটাবলিজমের সমস্যা দেখা দেয়। মানসিক দিক থেকেও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে, স্ট্রেস সহ্য করার ক্ষমতা কমে।
ডা. সুনীল আরও যোগ করেন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ওজন বৃদ্ধি এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাডড়ার প্রবণতার কথা।
এছাড়াও মানুষ খিটখিটে, উদ্বিগ্ন ও কম প্রোডাক্টিভ হয়ে পড়েন। ছোটখাটো ঝগড়াও বড় হয়ে ওঠে। অনেক সময় দম্পতিরা ক্লান্তিকেই সম্পর্কের সমস্যা বলে ভুল করেন।
আলাদা ঘুমালে কি ঘনিষ্ঠতা বাড়ে?
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাল ঘুম মানেই ভাল সম্পর্ক। এটাই গোড়ার কথা। ডা. ছাবড়ার মতে, “যদি দু’জনের সম্মতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে ঘনিষ্ঠতা বরং বাড়ে।” কারণ বিশ্রাম পাওয়া মানুষ বেশি সংবেদনশীল ও বোঝাপড়ায় সক্ষম হন।
গবেষণাতেও একই কথা উঠে এসেছে। ডা. সুনীল বলছেন, “ভাল ঘুম দৈনন্দিন চাপ কমায়, যোগাযোগ উন্নত করে। ফলে আবেগ ও শারীরিক ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, যদিও একসঙ্গে ঘুমোনো হয় না।”
রিচা আগরওয়াল, এক জন হোলিস্টিক লাইফ কোচের ভাষায়, “ঘুম হল নার্ভাস সিস্টেমের 'রিস্টার্ট বাটন', ক্লান্ত মস্তিষ্ক নিঃশর্ত ভালবাসতে পারে না। অর্থাৎ, রাতে দূরত্বই সারাদিনে সম্পর্কের উষ্ণতা ধরে রাখতে পারে।
আগে সমস্যার সমাধান করুন
তবে আলাদা ঘুমই সব সমস্যার প্রথম সমাধান নয়। অনেক ক্ষেত্রেই কিছু সহজ পরিবর্তনেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।
সমস্যার কারণ হতে পারে:
ডা. সুনীলের পরামর্শ:
রিচা আগরওয়ালও বলেন, ঘুমের আগে শান্ত রুটিন ও প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
আবেগের ভারসাম্য জরুরি
আলাদা ঘুম মানেই যেন দূরত্ব না তৈরি হয়, সেই দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। ডা. ছাবড়া সতর্ক করে বলছেন, “শারীরিক দূরত্ব তখনই সমস্যা, যখন তা মানসিক দূরত্বে পরিণত হয়।”
ডা. সুনীলের কথায়, আশ্বাস, স্নেহ, একসঙ্গে সময় কাটানো - এই সবই সম্পর্ককে মজবুত রাখে। কথা বলা, সময় দেওয়া, স্নেহ প্রকাশ এইগুলো বজায় থাকলে আলাদা ঘুম কেবল স্বাস্থ্যগত সিদ্ধান্তই থাকে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
‘স্লিপ ডিভোর্স’ কোনও বিচ্ছেদ নয়, বরং ক্লান্তির চক্র ভাঙার এক উপায়। দম্পতিরা যখন নিজেদের ঘুমকে গুরুত্ব দেন, তখন তাঁরা হয়ে ওঠেন আরও শান্ত, সহানুভূতিশীল ও কাছের। কখনও কখনও, সুস্থ সম্পর্কের শুরু হয় একটা 'ভাল রাতের ঘুম' দিয়েই।