বাবা-মা এবং প্রবীণরা আসলে একই দলের, শিশুর মঙ্গলই সবার লক্ষ্য।

এআই দিয়ে বানানো ছবি
শেষ আপডেট: 16 August 2025 20:06
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছ’মাস বয়স হতে যখন বাচ্চা মায়ের দুধের পাশাপাশি শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করে, তখন থেকে বাড়িতে যেন শুরু হয় এক যুদ্ধ। বাচ্চা কী খাবে না খাবে, তা ডাক্তার ঠিক করবে নাকি বাড়ির অভিজ্ঞ মা-ঠাকুমারা? বাচ্চার মা কার কথা শুনবে, এই নিয়ে চলে এক টানাপড়েন।
চিকিৎসকের স্পষ্ট নির্দেশ, অন্তত এক বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত শিশুর খাবারে নুন-চিনি নয়। বাড়ির বড়রা বলবেন, ডাক্তার সব জানে নাকি? নুন-চিনি না দিলে খাবারের স্বাদই বা পাবে কীভাবে?
যদি শিশুটি কোনওদিন নুন বা চিনি চেখেই না দেখে, তবে সে কীভাবে ওগুলোর অভাব বোধ করবে? এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন অনেক বাবা-মাই, চিকিৎসকের পরামর্শ বনাম পারিবারিক প্রথা, কার কথা শুনবেন, তাই নিয়ে দ্বিধা।
কেন ডাক্তাররা নিষেধ করছেন?
বেঙ্গালুরুর মণিপাল হাসপাতাল শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. নন্দিতা রত্নম বলেন, ‘শিশুর জীবনের প্রথম দু’বছর হচ্ছে ঘরের ভিতের মতো, মজবুত ও টেকসই হলে গোটা জীবনের স্বাস্থ্যের ভিত গড়ে ওঠে।’ অর্থাৎ, এই সময়ে যা খাবে, তার প্রভাব পড়বে ভবিষ্যতের বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যে এবং খাবারের প্রতি মানসিকতায়।
আর্টেমিস হাসপাতাল গুরগাঁওয়ের প্রধান শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. রাজীব ছাবরা বলেন, শিশুর কিডনি পুরোপুরি বিকশিত হয় না, তাই অতিরিক্ত নুন শরীর থেকে বেরতে পারে না। চিনির প্রভাবে দাঁতে ক্ষয়, খিদে কমে যাওয়া, ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস তৈরি হয়। তিনি জানান, ‘চিনি-নুনের অভ্যাস শুরু হলে আজীবনের জন্য মিষ্টি-নোনা খাবারের প্রতি আসক্তি তৈরি হয়। কিন্তু মায়ের দুধ, ফর্মুলা মিল্ক, ফল আর সবজিতেই শিশুর প্রয়োজনীয় মিষ্টি ও নুন মেলে।’
দু’বছরের কম শিশুকে চিনি দিলে কী ক্ষতি হয়?
অ্যাস্টার সিএমআই হাসপাতাল বেঙ্গালুরুর ডা. পারিমলা ভি তিরুমালেশ বলেন, শিশুকে ছোটবেলায় চিনি খাওয়ালে স্বাভাবিক কম-মিষ্টি খাবার গ্রহণ করতে অনীহা তৈরি হয়। দাঁতের ক্ষয়ও শুরু হতে পারে। অতিরিক্ত চিনি রক্তে হঠাৎ গ্লুকোজ বাড়ায়, যার ফলে খিটখিটে মেজাজ, ঘুমের ব্যাঘাত, এমনকী ভবিষ্যতে স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস পর্যন্ত হতে পারে।
ডা. ছাবরা যোগ করেন, জীবনের প্রথম ১০০০ দিনে চিনি এড়ালে বড় হয়ে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি অনেকটা কমে যায়।
দু’বছরের কম শিশুকে নুন দিলে কী ক্ষতি হয়?
হায়দরাবাদের কেয়ার হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. বিত্তল কুমার কেশিরেড্ডি বলেন, অতিরিক্ত নুন কিডনির উপর চাপ তৈরি করে। নুন খাবারের স্বাভাবিক স্বাদ ঢেকে দেয়, ফলে শিশুর স্বাদবোধ বিকশিত হয় না। ক্যালসিয়ামের ক্ষয় হয়ে হাড় দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আসলে মায়ের দুধ বা ফর্মুলা মিল্কেই শিশু দৈনিক প্রয়োজনীয় সোডিয়াম (প্রায় ০.২ গ্রাম) পেয়ে যায়।
দিদিমারা এই যুক্তি কেন মানতে চান না?
ডা. রত্নম বলেন, ‘অনেকে বলেন, আমরাও তো শিশুকে নুন-চিনি দিয়েছি, কিছু হয়নি। আসলে তখন এত তথ্য জানা ছিল না। আর এখনকার খাবারে আগে থেকেই অনেক বেশি লুকনো নুন-চিনি থাকে।’
ডা. ছাবরার মতে, দিদিমা-ঠাকুমারা নিজেদের রান্নার অভিজ্ঞতা থেকে মনে করেন, নিরামিষ বা কম তেল-ঝাল-মশলা দেওয়া খাবার মানেই স্বাস্থ্যকর নয়। তাই শিশুর খাবারেও নুন-চিনি চাই।
ডা. তিরুমালেশ যোগ করেন, তাঁদের সময়ে শিশুর খাবারে সামান্য নুন-চিনি দেওয়া ছিল ভালবাসার নিদর্শন। এখন সেটা না করতে বলা হলে তাঁরা মনে করেন খাবার নিরস হয়ে যাচ্ছে, কিংবা ঐতিহ্য নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান দেখিয়েছে, শিশুর জিভ আসলে প্রাকৃতিকভাবেই ফল, সবজি ও শস্যের আসল স্বাদ উপভোগ করার জন্য প্রস্তুত।
শুধু খাবারের বিষয় নয়, এখানে কাজ করে অন্য এক সমীকরণও
আমদাবাদের মনোচিকিৎসক ডা. সার্থক দাভে বলেন, প্রবীণদের দৃষ্টিতে শিশুকে নুন-চিনি না দেওয়া মানে বঞ্চিত করা। তাঁরা ভাবেন, এভাবে শিশুর বেড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে, নাতি-নাতনিদের খাবারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও তাঁদের হাত থেকে সরে যাচ্ছে, এই আবেগও কাজ করে।
সঠিক উপায় তাহলে কী? কী খাওয়ানো উচিত শিশুকে?
ডা. রত্নম পরামর্শ দেন, প্রথম দু’বছর নুন-চিনি না দিয়ে প্রাকৃতিক মিষ্টি যেমন কলা, আম, এবং সবজির আসল স্বাদ শিশুদের বোঝানো উচিত।
ডা. তিরুমালেশ বলেন, এক বছর বয়সের পর ধীরে ধীরে সামান্য নুন দেওয়া যেতে পারে, তবে চিনি শুধু বিশেষ দিনে। বিকল্প হিসেবে হালকা মশলা, হার্বস, বা ফলের স্বাভাবিক মিষ্টি ব্যবহার করা যেতে পারে।
সবশেষে ডাক্তারদের পরামর্শ - বাবা-মা এবং প্রবীণরা আসলে একই দলের, শিশুর মঙ্গলই সবার লক্ষ্য। ঐতিহ্য মেনে চলা ভাল, তবে নতুন বৈজ্ঞানিক জ্ঞানও মানতে হবে। আজকের দিনে শিশুদের সঠিক খাবারের অভ্যাসই তাদের ভবিষ্যতের সুস্থ জীবনের ভিত গড়ে দেবে।